“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

উনিশ শতকে বাংলার গ্রামীণ সমাজ ও সামাজিক আন্দোলন

লালন ফকিরের গান, গবেষকদের মতে, গভীর নির্জন পথে মনের মানুষকে খুঁজে ফেরার গান। লালন ফকিরের গান সাধনপথের গান। এটি অনেকাংশেই সত্য। কিন্তু লালন ফকিরের গান যথার্থ অর্থেই মুক্তির গান। এই মুক্তি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক—উভয়ই। এই গানে যেমন মনের মানুষকে খুঁজে ফেরার তাগিদ রয়েছে, তেমনি সমাজবিপ্লবের বীজমন্ত্রও রয়েছে সমানভাবে। কারণ লালন ফকিরের গান তাঁর জীবনাভিজ্ঞতার ফসল।

লালন তাঁর সমাজের একজন প্রাগ্রসর ব্যক্তি ছিলেন। বাউল বললেই অনেকের মনে হতে পারে, তিনি সমাজবিচ্ছিন্ন উন্নাসিক ব্যক্তি ছিলেন। তা কিন্তু নয়। তিনি পুরোদস্তুর সামাজিক মানুষ ছিলেন। অধ্যাত্মবাদ তাঁর স্বভাবদর্শন আর সমাজবিপ্লব হলো তাঁর সামাজিক অভিজ্ঞতার ফসল।

সমাজের আর দশজন গীতিকবির সঙ্গে লালনের পার্থক্য হলো—তিনি বিনোদনের জন্য কখনো কোনো গান বাঁধেননি। তিনি তাঁর সমাজ-অভিজ্ঞতা এবং স্বভাবজাত তাগিদ থেকে গান বেঁধেছেন। যে কারণে তাঁর গান মানুষের মুক্তির গান হয়ে পথ দেখিয়েছে সব কালে সকল মানুষের জন্য। তিনি মনের মানুষকে খুঁজেছেন, সত্য-সুপথের সন্ধান দিয়েছেন—সমাজে জ্বেলেছেন মুক্তির মশাল।

ভাবা যায়, সেই উনিশ শতকের মতো বদ্ধ সমাজে বসে তিনি সুরের মাধ্যমে সকল অসুরকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন। জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের আত্মিক দীনতা—সবকিছুই তাঁর মরমি মনের অভিব্যক্তি হয়ে দেখা দিয়েছে।

লালন ফকিরের সাধনা বা গান আকস্মিক সৃষ্টি নয়। তাঁর সৃষ্টির পেছনে একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। তিনি ভাবের ঘোরে গান বাঁধলেও সেই ভাব ছিল গভীর চিন্তাপ্রসূত মানবমুক্তির দর্শন প্রচারের সেতুবন্ধ। লালন ফকির একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক সাধক ও সমাজবিপ্লবী। তাই শুধু আধ্যাত্মিকতার আলোচনা লালন ফকির সম্পর্কে সম্পূর্ণ পাঠ নয়। তাঁকে পরিপূর্ণভাবে জানতে হলে তাঁর আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি সমাজবিপ্লবকেও সমানভাবে তুলে ধরতে হবে।

আমরা লালন ফকিরকে খণ্ডিতভাবে না জেনে পরিপূর্ণ লালন ফকিরকে জানতে চাই। তাই তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনের পাশাপাশি সমাজদর্শনও সমগ্রত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে চাই। আর তাঁর সমাজদর্শনকে তুলে ধরতে হলে তাঁর সময়, সমাজ, সমাজ-কাঠামো ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে।

লালনের জন্ম কবে, কখন, কোথায়? এ প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। আর হওয়া সম্ভবও নয়। প্রচলিত মতানুসারে লালন ভেসে এসেছিলেন কুষ্টিয়ায়। ভেসে আসার ঘটনা সত্য হলেও তিনি যে বাংলার বাইরের কোনো জনপদ থেকে ভেসে আসেননি তা বলা যায়। লালন বাংলাদেশে বাস করেছেন, বাংলা ভাষায় কথা বলেছেন, বাংলায় গান বেঁধেছেন—রেখে গেছেন আমাদের জন্য ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত দর্শনের উত্তরাধিকার—তাই লালনের জন্ম বাংলাতে বলেই আমরা মান্য করব।

আমাদের অনেকেরই মনে হয়তো প্রশ্ন জাগে, নিরক্ষর লালন তাঁর এই ভাবদর্শনই বলি আর তত্ত্বদর্শনই বা সমাজের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার শিক্ষা ও সাহস পেলেন কোথা থেকে। লালন ছিলেন গ্রামের মানুষ। বাস করতেন তৎকালীন অন্ত্যজ শ্রেণির সঙ্গে—যাদের মধ্যে না ছিল কোনো আধুনিক শিক্ষা উপকরণ, না ছিল সমাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মতো সাহস। তাহলে লালন এতসব জ্ঞানের কথা, এত সাহস পেলেন কোথা থেকে?

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আমাদের লালনের সমাজ ঘুরে আসতে হবে। সময়টা যদি ধরি উনিশ শতকের প্রথমার্ধ, তাহলে বাংলার সামাজিক ইতিহাস আমাদের কী বলে? বা লালনের জন্মকাল যেটাকে কল্পনা করা হয় সেই ১৭৭৪ সাল বা তার অব্যবহিত পূর্ব ও উত্তরকালীন বাংলার সমাজটা কেমন ছিল?

ঐতিহাসিক সূত্র মতে, ১৭৭৪ সালকে যদি লালনের জন্মসাল মেনে নিই তাহলে দেখা যাবে লালনের জন্ম পলাশীর যুদ্ধের ঠিক ১৭ বছর পরে। ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ পরিবর্তনে পলাশীর যুদ্ধ এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ পলাশীর যুদ্ধের পরই ভারতীয় সমাজ দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হতে থাকে।

সেটা যাই হোক, ভারতের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে ইতোমধ্যে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যাপক পটপরিবর্তন হয়ে গেছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এদেশের শাসনক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়। আর এই যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের কারণ হিসেবে মীরজাফরের বেইমানিকে বড় করে দেখা হলেও এর পেছনের অনুঘটক যে তৎকালীন নবাব রাজ্যের প্রতিপত্তিশীল হিন্দুরা ছিলেন সেকথা বলা বাহুল্য। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রতি হিন্দু এসব ধনকুবেরের মূল প্রতিহিংসার কারণও ঐতিহাসিক।

মোগলরা এদেশে একের পর এক হিন্দু রাজাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়, সেইসঙ্গে বাড়তে থাকে হিন্দুদের মুসলমান-বিরোধ। কিন্তু মোগলদের বলিষ্ঠ শাসনের জন্য তারা কোনোত্রেই কোনো মওকা করে উঠতে পারেনি। কিন্তু মনের মাঝে ফুঁসতে থাকা প্রতিহিংসার অনির্বাণ শিখা ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে।

মোগল শাসনের শেষ দিকে নিজেদের মধ্যকার আত্মকলহ, দুর্বল প্রশাসন, নিজেদের ভোগবিলাসে অধিক মত্ত হয়ে পড়া, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘ট্রেড নট টেরিটরি’ নীতির পরিবর্তে ‘টেরিটরি নট ট্রেড’ নীতির পরিবর্তন এবং এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে প্রভাবশালী হিন্দু ব্যক্তিদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার শিকার হয়ে মীরজাফর ও নবাব পরিবারের কারো কারো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কূটনীতির ফাঁদে পা দেওয়া—এসব কারণেই মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনভার গিয়ে পড়ে ইংরেজদের হাতে।

আর এদেশের প্রভাবশালী হিন্দুরা ইংরেজ সরকারকে স্বাগত জানিয়ে যখন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তখন এখানকার মুসলমানরা মনোজগতে রাজ্য হারানোর ব্যথায় ইংরেজদের প্রতি ক্রমেই হয়ে ওঠে বিদ্বেষী এবং স্পষ্টভাবেই তারা ইংরেজদের প্রত্যাখ্যান করে তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে। এমন অবস্থায় হিন্দুরা সমাজের সর্বক্ষেত্রে মুসলমানদের চেয়ে এগিয়ে যেতে থাকে।

সমাজে সৃষ্টি হয় ভূঁইফোড় জমিদার শ্রেণির। সমাজে বাড়তে থাকে শোষণ, নিপীড়ন; যার ফলে ঘটে যায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। সমাজ-কাঠামোতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। সমাজে এক ধরনের অস্থির অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই অস্থির অবস্থার মধ্যেই লালনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায়।

১৭৮৭ সালে ফকির আন্দোলনের নেতা মজনু শাহর মৃত্যু, ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব, ১৭৯২ সালে ফকির আন্দোলনের নেতা মজনু শাহর মৃত্যু, ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে লালনের শিশুকাল থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ। লালনের মানসভূমি এভাবেই কালের স্বাক্ষর ধারণ করে এগিয়ে চলে সমাজের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে।

লালনের শৈশব, কৈশোর, যৌবন কোথায়, কীভাবে কেটেছে তার কোনো তথ্য বা প্রামাণিক দলিল নেই আমাদের হাতে। বারবার তাই আমাদের প্রচলিত কিংবদন্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে—যদিও এসব কিংবদন্তিকে গ্রহণ বা বর্জন কোনোটাই করার পক্ষপাতী নই

কুষ্টিয়ার কালীগঙ্গা নদীর ঘাট থেকে মৃত্যুপথযাত্রী লালনকে যখন উদ্ধার করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর—এমন বিশ্বাস ভক্ত-অনুরাগীদের। লালনের আনুমানিক জন্মসালকে হিসাব ধরলে তা দাঁড়ায় ১৮০০ সালে। তাহলে ভক্ত-অনুরাগীদের বিশ্বাসের জোরে ধরে নেওয়া যেতে পারে, ছেউড়িয়াতে লালনের বসবাস ১৮০০ সাল বা তার অব্যবহিত পর থেকেই। অবশ্য গবেষকেরা বলছেন, লালন নানা তীর্থ ভ্রমণ শেষে ১৮২৩ সালে ছেউড়িয়ায় এসে আখড়া স্থাপন করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, লালন ছেউড়িয়াতে উনিশ শতকের একেবারেই প্রথম দিক থেকে বসবাস শুরু করেন।

এখন আমরা সেই সময়ের বাংলার সামাজিক ইতিহাসটা একটু জেনে আসি। ফকির লালন সাঁইজি যে স্থানটিতে এসে আখড়া স্থাপন করেন তা স্থানীয় মলম কারিগরের জায়গা এবং এটি কুমারখালী থানার অন্তর্গত। ইতিহাস থেকে কুমারখালীর যেটুকু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে এটি একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক স্থান হিসেবে পরিগণিত এবং তা ঠাকুর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ছেউড়িয়া থেকে কুমারখালীর দূরত্ব বেশ কয়েক মাইলের।

১৮৭২ সালের সেন্সাস রিপোর্ট থেকে জানা যায়, নদীয়া জেলার ছয়টি মহকুমা ছিল। এগুলো হলো—

  • কৃষ্ণনগর
  • মীরপুর
  • কুষ্টিয়া
  • চুয়াডাঙ্গা
  • বনগাঁ
  • রানাঘাট

এ সময় এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ১২ হাজার ৭৯৫।

কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত যে ছয়টি থানা ছিল, তা হলো—

  • দৌলতপুর
  • নোয়াপাড়া
  • কুষ্টিয়া
  • কুমারখালী
  • ভালুকা
  • ভাদুরিয়া

এর মধ্যে কুমারখালী থানার আয়তন ছিল সে সময় (১৮৭২ সালে) ১১০ বর্গমাইল। কুমারখালীর অন্তর্গত গ্রাম ও শহরের সংখ্যা ছিল ২৪২। মোট বাড়ির সংখ্যা ১৪ হাজার ৫৮১ এবং মোট জনসংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার ২৫৪।

এ সময় কুমারখালী ছিল বৃহত্তম তাঁত ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে নীলকুঠিও ছিল। এছাড়া ৫২টি নীলকুঠির হেড অফিস ছিল কুমারখালীতে। রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর শিলাইদহে নীলকুঠি স্থাপন করেছিলেন। এছাড়া কুমারখালীতে রেশমকুঠিও ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবেও কুমারখালীকে আমরা পাচ্ছি এই সময়ে। কুমারখালী ছিল তাঁতিদের তৈরি বস্ত্রের বৃহত্তম হাট, শান্তিপুর, কুমারখালী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার তাঁতিরা এখানে এসে কাপড় বিক্রি করতেন।

কুমারখালীর উকিল রাইচরণ দাসের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়:

‘দেশি মহাজনের মধ্যে কুমারখালী ও আমলার সাহেববাবুদের এবং ঘোষবাবুদের চাউল ও ঘৃতের কারবার ছিল। বড় সায়ার বা নৌকায় (দৈর্ঘ্য ১০০ হাত, প্রস্থ ৩০ হাত) চাউল আমদানী হইত এবং কলিকাতায় নীত হইত... বড় কারবারের মধ্যে সাহেব কোম্পানীর রেশমের কুঠি ছিল। কুমারখালীর রেশম খুব প্রসিদ্ধ ছিল। কোম্পানীর রেশমকুঠি থাকায়, তার পরিচালনার লক্ষ্যে একজন ইংরেজ কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট বাস করতেন।’

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কুমারখালীর সঙ্গে কলকাতার রেল যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কাঙাল হরিনাথের জীবনীকার লিখেছেন, ‘এই সময় কুমারখালী নদীয়া জেলার “ম্যানচেস্টার” ছিল বলিলেও অত্যুক্তি হয় না, অসংখ্য তাঁতী নানা রকম বস্ত্র প্রস্তুত করিত, এবং ইহার নাম সুদূর ইংল্যান্ড পর্যন্ত পরিচিত ছিল; এখানে মাননীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেশমের কুঠি ছিল, এবং “কুমারখালী মার্কা” রেশমের কাপড় অধিক মূল্যে বিলাতের বাজারে বিক্রয় হইত, কুমারখালীর নীল কাপড়ের পাকা নীল রঙের জন্য সাহেব সওদাগরদিগের মনে লোভ সঞ্চার হইত।’

যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতির কালে কুমারখালীও এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মর্যাদা লাভ করে। এই কুমারখালীতে বসেই গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ১৮৬৩ সালে তাঁর গ্রামবার্তা প্রকাশিকা প্রকাশ করেছেন।

এতে সহজেই অনুমিত হয় যে, কুমারখালী তখন নিঃসন্দেহে খুব উৎকৃষ্ট ভূমি ছিল—কি শস্য উৎপাদনে, কি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে, কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে। বিশিষ্ট গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী বলেছেন,

‘শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কুমারখালীর ইতিহাস অর্বাচীন নয়। নবাবি আমল থেকেই এখানে টোল-চতুষ্পাঠী-মক্তব-পাঠশালা ছিল। ইংরেজ আমলে চন্দ্রকুমার তর্কবাগীশ, সীতানাথ স্মৃতিভূষণ প্রমুখ পণ্ডিতের টোলের বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। ইংরেজ আমলে এই দূর-মফস্বলেও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজি শিক্ষার জন্য উনিশ শতকের চারের দশকেই কুমারখালীতে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। হাইস্কুলটির নাম এম. এন. বিদ্যালয়, যা ১৮৫৬ সালে সরকারি অনুমোদন লাভ করে। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় প্রখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী মথুরানাথ কুণ্ডু। কথিত আছে, তিনি গড়াই নদীতে গভর্নর জেনারেল (১৮৪৪-৪৮) লর্ড হার্ডিঞ্জের স্টিমার থামিয়ে তাঁকে স্কুল পরিদর্শন করান এবং সেই গভর্নর জেনারেলের সুপারিশের ফলে লর্ড ডালহৌসির আমলে (১৮৪৮-৫৬) যখন মফস্বলের স্কুলে সরকারি আর্থিক মঞ্জুরির ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তখন কুমারখালীর এই স্কুলটিই প্রথম সাহায্য লাভ করে।

সমকালীন নানা তথ্য-উপাত্তে স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারের নানা ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণের পাশাপাশি সমকালীন সমাজে স্ত্রীদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তাঁর গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত ‘স্ত্রী-শিক্ষা’ প্রবন্ধে প্রচলিত স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধে বলেন, ‘এক্ষণে বালিকাদিগকে যে প্রকার শিক্ষা প্রদান করা হইতেছে, তাহাতে বিশেষ কোনো ফল দর্শিতেছে না। পাঠশালাতে বালিকারা অধিক দিন শিক্ষা লাভ করিতে পারে না। এবং অন্তঃপুরেও কোনো রূপ উচ্চশিক্ষা প্রদানের রীতি প্রচলিত হয় নাই।

‘...এক্ষণে আমরা বালিকা-পাঠশালার শিক্ষক মহাশয়দিগকে অনুরোধ করিতেছি, তাঁহারা নিয়মিত পাঠ ব্যতীত গল্পচ্ছলে নানা প্রকার সদুপদেশ প্রদান করিয়া বালিকাদিগের চরিত্র নির্মল করিতে সর্বদা যত্ন করিবেন। এরূপে উপদেশ দিবেন, যেন তারা উচ্চতর শিক্ষাপ্রাপ্ত না হইলেও কেবল শিক্ষকের উপদেশ শাস্ত্রে সকল প্রকার কুটুম্ব কর্তব্য করিতে সমর্থ হয়। কোনো অসচ্চরিত্র লোক তাহাদিগের ধর্ম নষ্ট করিতে না পারে।’

অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, খুব স্বল্পপরিসরে হলেও নারীশিক্ষার চল শুরু হয়ে গিয়েছিল কুমারখালীতে। এই আমলে কুমারখালী ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিক্ষাদীক্ষায় যেমন, তেমনি সাংস্কৃতিক দিকেও বেশ সমৃদ্ধ ছিল। যাত্রা, পালাগান, কবিগানে মুখর ছিল লালনের সময় ও সমাজ। আবুল আহসান চৌধুরী বলেছেন,

‘ইংরেজ আমলে কুমারখালী-পল্লীর সংস্কৃতি চর্চা মূলত পাঠশালা-কীর্তন-কবিগান-গীতাভিনয়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল।’ জগদ্বন্ধু সেনের জবানিতে জনাব চৌধুরী আরো বলেন, ‘উনিশ শতকের সূচনা-পূর্বে কুমারখালী অঞ্চলে কবিগানের অত্যন্ত প্রসার ও প্রচলন ছিল এবং কুমারখালীতে বেশ কয়েকটি কবিগানের দলও ছিল।’

ভোলানাথ মজুমদারের একটি কবিতার উদ্ধৃতিতে তিনি বলেন, ‘ভোলানাথ মজুমদারের একটি কবিতায় কুমারখালীর সাংস্কৃতিক পরিবেশের কিছুটা পরিচয় মেলে :

তরুণ ছায়ায় পাতার কুটীরে ভারতী মায়ের আসন পাতা,

কত না পুণ্য বাণীর চরণে অঞ্জলি দিল, নুইল মাথা ...

বার মাসে তের পালা-পার্বণ, যাত্রা পাঁচালী চণ্ডীগান,

সুস্থ সতেজ সবল শরীর, উৎসবভরা সবার প্রাণ।’

Add comment
Posting any form of obscene comment is prohibited; doing so will result in legal action.

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন