“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি… আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে তাকওয়াবান।” — সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩

Select your language

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র ও সাধারণ মানুষদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র ও সাধারণ মানুষদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন
  • Sub Title: ঐক্যের প্রশ্নে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংকট

বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি বৈষম্য, স্বৈরশাসন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার—সব পর্যায়েই জনগণ রাজপথে নেমেছে। কিন্তু বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, এই দীর্ঘ ইতিহাসে ধর্ম, শিক্ষা, সমাজ কিংবা রাজনীতির প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ কখনো স্থায়ী ও সর্বজনীন ঐক্যে পৌঁছাতে পারেনি। বরং বিভাজনই বারবার শক্তিশালী হয়েছে।

একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, যেখানে ধর্ম, শ্রেণি, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে বাঙালি একটি অভিন্ন চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

এই প্রবন্ধের মূল গবেষণা প্রশ্ন হলো:

কেন ভাষা আন্দোলনের সময় যে সর্বজনীন ঐক্য সম্ভব হয়েছিল, তা বাংলাদেশে আর কোনো ক্ষেত্রেই পুনরাবৃত্তি ঘটেনি?

ঐক্য কী: একটি তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

মাজবিজ্ঞানের ভাষায়, ঐক্য (Unity) বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা যেখানে ভিন্ন পরিচয় ও স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষ একটি সাধারণ লক্ষ্য ও নৈতিক ভিত্তির ওপর সমবেত হয়

ঐক্য সাধারণত তিনটি শর্তের ওপর নির্ভর করে:

  1. সার্বজনিক স্বার্থ (Collective Interest)
  2. নৈতিক বৈধতা (Moral Legitimacy)
  3. সমান অংশগ্রহণের সুযোগ (Inclusive Participation)

এই তিনটির যেকোনো একটি অনুপস্থিতি থাকলে ঐক্য হয় সাময়িক, ভঙ্গুর বা কৃত্রিম (Bourdieu, 1977; Tilly, 2004)।

ধর্ম ও বাংলাদেশ: ঐক্যের বদলে বিভাজনের রাজনীতি

ধর্ম বাংলাদেশের মানুষের জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু ধর্ম কখনোই এখানে সর্বজনীন ঐক্যের ভিত্তি হতে পারেনি।

পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতা

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ধর্মীয় ঐক্যের ধারণা ভেঙে পড়ে। কারণ:

  • ধর্ম সমতা নিশ্চিত করেনি
  • ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করা হয়েছিল
  • রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল একপক্ষের হাতে

ফলে ধর্মীয় পরিচয় জনগণের কাছে ন্যায়ের প্রতীক না হয়ে ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে ওঠে (Asad, 2003; Alavi, 1972)।

স্বাধীন বাংলাদেশেও ধর্মের সীমাবদ্ধতা

স্বাধীনতার পরও ধর্ম কখনো জাতীয় ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেনি, কারণ:

  • ধর্মীয় ব্যাখ্যা বহুমাত্রিক ও বিতর্কিত
  • ধর্ম রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে
  • সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে

“যে পরিচয় ন্যায় ও সমতার নিশ্চয়তা দেয় না, তা দীর্ঘমেয়াদি ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে না” (Ahmed, 1980)।

শিক্ষা ও সমাজ: শ্রেণিভিত্তিক বিভাজনের কাঠামো

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা ঐক্য তৈরির বদলে সমাজকে খণ্ডিত করেছে।

তিন ধারার শিক্ষা, তিন রকম সমাজ

  1. ইংরেজি মাধ্যম
  2. বাংলা মাধ্যম
  3. মাদ্রাসা শিক্ষা

এই তিন ধারার শিক্ষার্থীরা একই রাষ্ট্রে বসবাস করলেও:

  • চিন্তার ভাষা আলাদা
  • মূল্যবোধ আলাদা
  • ভবিষ্যৎ কল্পনাও আলাদা

ফলে শিক্ষা জাতীয় ঐক্যের সেতু না হয়ে শ্রেণিগত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে (Sen, 2006; Nurul Kabir, 2002)।

সামাজিক বিভাজনের ফল

  • শিক্ষিত বনাম অশিক্ষিত
  • শহর বনাম গ্রাম
  • এলিট বনাম সাধারণ মানুষ

সমাজে “আমরা” তৈরি হয়নি, তৈরি হয়েছে “ওরা”।

রাজনীতি: জনগণের আন্দোলন বনাম দলের ঐক্য

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু গণআন্দোলন হয়েছে—১৯৬৯, ১৯৯০, ২০২৪। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই স্থায়ী ঐক্যে রূপ নেয়নি।

কেন রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে পড়ে

  • রাজনৈতিক ঐক্য হয় লক্ষ্য পূরণ পর্যন্ত
  • ক্ষমতা অর্জনের পর বিভাজন শুরু হয়
  • নেতৃত্ব জনগণের কাছে জবাবদিহি করে না

“বাংলাদেশে আন্দোলন করে জনগণ, কিন্তু ইতিহাস লিখে দল” (Guha, 1998)।

এই বাস্তবতা রাজনীতিকে জনগণের ঐক্যের জায়গা নয়, বরং ক্ষমতার প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত করেছে।

ভাষা আন্দোলন: কেন এটি ব্যতিক্রম

ভাষা আন্দোলন ব্যতিক্রমী, কারণ এটি ছিল সবার অস্তিত্বের দাবি।

ভাষা ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন

ভাষা আন্দোলন কোনো নীতি বা সুবিধার দাবি ছিল না। এটি ছিল:

  • নিজের কথা বলার অধিকার
  • নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি
  • সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম

এই দাবি ছিল সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য (Anisuzzaman, 1992; Badaruddin, 2005)।

অংশগ্রহণের সর্বজনীনতা

ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল:

  • ছাত্র
  • শ্রমিক
  • কৃষক
  • নারী
  • শহর ও গ্রামের মানুষ

কেউ বাদ পড়েনি, কারণ ভাষা কাউকে বাদ দেয় না।

নেতৃত্ব ও নৈতিকতা

ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব:

  • ক্ষমতার জন্য নয়
  • ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়
  • নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য

ফলে জনগণ নিঃশর্তভাবে একাত্ম হয়েছিল।

“ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে—যেখানে দাবি ন্যায়সঙ্গত, সেখানে ঐক্য আপনা-আপনি জন্ম নেয়” (Rafiuddin Ahmed, 1980)।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ক্ষেত্র ঐক্যের ভিত্তি বাস্তব চরিত্র ফলাফল
ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত, ব্যাখ্যাভেদে বিভক্ত সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক বিভাজন
শিক্ষা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন ইংরেজি-মাধ্যম, বাংলা-মাধ্যম ও মাদ্রাসা—শ্রেণিভিত্তিক বিভাজন সামাজিক বৈষম্য ও পারস্পরিক দূরত্ব
রাজনীতি ক্ষমতা ও দলীয় স্বার্থ আন্দোলন জনগণের, নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক দলের হাতে সাময়িক ঐক্য, দীর্ঘমেয়াদি বিভক্তি
ভাষা আন্দোলন অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক অধিকার সর্বজনীন অংশগ্রহণ ও নৈতিক নেতৃত্ব সর্বজনীন ও টেকসই ঐক্য

এই তুলনা স্পষ্ট করে—ভাষা আন্দোলনের ঐক্য ছিল কাঠামোগত ও নৈতিকভাবে শক্ত।

সমসাময়িক বাংলাদেশ ও ভাষা আন্দোলনের শিক্ষা

আজকের বাংলাদেশে আবারও ঐক্যের সংকট তীব্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ধর্মীয় উগ্রতা—সব মিলিয়ে বিভাজন আরও গভীর।

ভাষা আন্দোলন আমাদের শেখায়:

  • ঐক্য চাপিয়ে দেওয়া যায় না
  • ঐক্য তৈরি হয় ন্যায়ের প্রশ্নে
  • ঐক্য টিকে থাকে নৈতিক নেতৃত্বে

“যেখানে দাবি সার্বজনিক, সেখানে ঐক্য অনিবার্য” (Anisuzzaman, 1992; Ahmed, 1980)।

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, ঐক্য কোনো স্লোগান নয়—এটি একটি নৈতিক প্রকল্প। ভাষা আন্দোলন সেই প্রকল্পের একমাত্র সফল উদাহরণ, যেখানে মানুষ নিজের চেয়ে বড় কিছুতে বিশ্বাস করেছিল।

আজ যদি আমরা আবার ঐক্য চাই, তবে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—

“আমাদের দাবি কি সত্যিই সবার?”

ভাষা আন্দোলনের উত্তর আজও প্রাসঙ্গিক।

References

  1. Anisuzzaman, A. (1992). ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ. বাংলা একাডেমি, ঢাকা.
  2. Badaruddin, U. (2005). ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম. জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন.
  3. Ahmed, R. (1980). The Bengal Muslims 1871–1906. Oxford University Press.
  4. Asad, T. (2003). Formations of the Secular. Stanford University Press.
  5. Alavi, H. (1972). The State in Post-Colonial Societies. London: Macmillan.
  6. Bourdieu, P. (1977). Reproduction in Education, Society and Culture. Sage Publications.
  7. Nurul Kabir, N. (2002). রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি. সাহিত্য প্রকাশ.
  8. Sen, A. (2006). Identity and Violence. W.W. Norton & Company.
  9. Tilly, C. (2004). Social Movements, 1768–2004. Paradigm Publishers.
  10. Guha, R. (1998). Dominance without Hegemony. Harvard University Press.
  11. Rafiuddin Ahmed, R. (1980). Bengal Muslims: Nationalism and Identity. Dhaka University Press.

Comments

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন