বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কুষ্টিয়া এক অনন্য অধ্যায়। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজীর আধ্যাত্মিক দর্শন, মানবপ্রেম ও লোকসংগীতের ধারা আজও কুষ্টিয়ার মাটিতে জীবন্ত। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ছেঁউরিয়ার আখড়াবাড়িতে প্রতি বছর দুটি বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয়—যা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং কুষ্টিয়ার হস্তশিল্প, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের মহা উৎসবে পরিণত হয়।
লালন মেলা: দোল পূর্ণিমা ও তিরোধান দিবস
প্রতি বছর দু’বার লালন আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে হাজারো ভক্ত, বাউল, গবেষক ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে—
- ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমায় পালিত হয় লালন স্মরণে দোল উৎসব, যেখানে সারা রাত ধরে বাউলগান, ভাবগান ও সাধুসঙ্গ চলে।
- ১লা কার্তিক পালন করা হয় লালন শাঁইজীর তিরোধান দিবস, যেদিন তাঁর চিরবিদায়ের স্মরণে সাধুসঙ্গ ও মেলার আয়োজন হয়।
এই দুই মেলাই কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণ, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতির ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে মানবতার সুরে একাত্ম হয়।
হস্তশিল্পের রঙে ভরে ওঠে লালন মেলা
লালন মেলা শুধু ভাবসঙ্গীতের উৎসব নয়, এটি হস্তশিল্পেরও এক মহা প্রদর্শনী।
মেলার মাঠজুড়ে দেখা যায় কুষ্টিয়ার কারিগরদের তৈরি নানা শিল্পসামগ্রী—
🧵 তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি, ওড়না, গামছা
🪶 মৃৎশিল্পের কলস, ফুলদানি, প্রদীপ, পুতুল ও সাজসজ্জার সামগ্রী
🎋 বাঁশ-বেতের চাটাই, ঝুড়ি, দোলনা ও গৃহস্থালির জিনিসপত্র
🪡 নকশিকাঁথা, হাতের সেলাই ও কাঠের কাজ
এক সময় এই কুষ্টিয়া অঞ্চলেই সূক্ষ্ম মসলিন কাপড় বোনা হতো—যা আজ বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য। কিন্তু এই মেলাগুলোতে সেই শিল্পভাব এখনো বেঁচে আছে নতুন রূপে।
দেশের নানা জায়গা থেকে আগত দর্শনার্থীরা এসব হস্তশিল্প কিনে নিয়ে যান স্মৃতিস্বরূপ, যা স্থানীয় কারিগরদের জীবিকায় বড় ভূমিকা রাখে।
ঐতিহ্যবাহী খাবারের রসনা মেলা
লালন মেলার আরেকটি বড় আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খাবার।
মেলার প্রতিটি গলিতেই ছড়ানো থাকে নানা স্বাদের আয়োজন—
🍘 কালায়ের রুটি — বাউল ও সাধুদের পছন্দের খাবার, ঘি ও গুড়ের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
🍯 জিলাপি, মণ্ডা, নলেনগুড়ের মিষ্টি ও লাড্ডু — মেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টান্ন।
🍿 খই, মুড়কি, চিড়া, বাতাসা, ঘোল — কুষ্টিয়ার লোকজ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
🥞 পিঠা-পায়েস, সরিষার তেলভাজা ও স্থানীয় ঝালমুড়ি-পানীয় — মেলাকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
এসব খাবারের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ার গ্রামীণ রন্ধন ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
হস্তশিল্প ও সংস্কৃতির মিলনস্থল
লালন মেলায় সংগীত, হস্তশিল্প ও লোকখাদ্যের এই অনন্য সংমিশ্রণ গ্রামীণ জীবনের প্রকৃত রূপ তুলে ধরে।
এ যেন এক জীবন্ত লোকসংস্কৃতি জাদুঘর, যেখানে মানুষ তার শিকড় ও সংস্কৃতির গৌরবে ফিরে যায়।
লালন শাঁইজীর বাণী—
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”—
এই মেলার প্রতিটি রঙে, সুরে, গন্ধে যেন প্রতিধ্বনিত হয়।
লালন মেলা কুষ্টিয়ার সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের মিলনক্ষেত্র।
এখানে হস্তশিল্পের মাধ্যমে কারিগররা জীবিকা অর্জন করেন, আর খাবারের মাধ্যমে রন্ধনশিল্পীরা তুলে ধরেন মাটির গন্ধ।
লালনের মানবতাবাদী দর্শন যেমন মানুষকে ভেদাভেদহীন ভালোবাসা শিখিয়েছে, তেমনি এই মেলা আমাদের শেখায়— “সংস্কৃতি মানে মাটির সঙ্গে মানুষের বন্ধন।”
প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমায় লালন স্মরণে দোল উৎসব এবং ১লা কার্তিকে লালন শাঁইজীর তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়ায় লালন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলায় তাঁতের কাজ, বাঁশ-বেতের পণ্য, মৃৎশিল্পসহ নানা হস্তশিল্প প্রদর্শিত হয়। এছাড়া কালায়ের রুটি, জিলাপি, খই, মুড়কি প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমারোহ থাকে। লালন মেলা কুষ্টিয়ার লোকজ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের প্রতীক।

Comments