“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি… আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে তাকওয়াবান।” — সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩

Select your language

কুষ্টিয়ার হস্তশিল্প: ঐতিহ্যের বুননে সৃজনের গল্প
কুষ্টিয়ার হস্তশিল্প: ঐতিহ্যের বুননে সৃজনের গল্প

বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো হস্তশিল্প। মাটির ঘ্রাণে, বেতের বুননে ও রঙিন সুতার সেলাইয়ে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়, তা শুধু পণ্য নয়—এ যেন জীবনের শিল্পরূপ। কুষ্টিয়া জেলা সেই শিল্প-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ নিজেদের সৃজনশীলতা ও শ্রম দিয়ে তৈরি করছে নানান হস্তশিল্প সামগ্রী, যা আজ দেশজুড়ে পরিচিত।

ঐতিহ্যের সূচনা ও মসলিনের ইতিহাস

ঐতিহাসিকভাবে কুষ্টিয়া অঞ্চল প্রাচীন নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পদ্মা ও গড়াই নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলে একসময় ঢাকার মতোই মসলিন কাপড় তৈরির কৌশল প্রচলিত ছিল। শিলাইদহ ও কুমারখালী অঞ্চলের তাঁতিরা সূক্ষ্ম সুতায় এমন কাপড় বুনতেন, যা আলোয় ঝলমল করত। পরবর্তীকালে এ শিল্প ধীরে ধীরে রূপ নেয় বর্তমানের তাঁত শিল্পে।

বয়ন শিল্প

কুষ্টিয়ার তাঁত শিল্প দেশের প্রাচীন বয়ন ঐতিহ্যের ধারক। বিশেষ করে মিরপুর, ভেড়ামারা, কুমারখালী ও শিলাইদহ অঞ্চলে আজও তাঁতের শব্দে ভরে ওঠে গ্রাম। এখানকার তাঁতিরা তৈরি করেন শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, চাদর—সবই অনন্য নকশা ও রঙের মেলবন্ধনে। অনেক পরিবার এই শিল্পে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুক্ত থেকে ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

মৃৎশিল্প

খোকসা, দৌলতপুর ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মৃৎশিল্পীরা তৈরি করেন কলস, হাঁড়ি, ফুলদানি, ও নানা শৌখিন সামগ্রী। আগে এই শিল্প ছিল কেবল নিত্যব্যবহার্য পণ্যের জন্য, এখন তা হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি ও শৌখিনতার প্রতীক। স্থানীয় মেলাগুলোতে ও পর্যটন কেন্দ্রে কুষ্টিয়ার মাটির কাজ এখনো জনপ্রিয়।

বাঁশ-বেত ও কাঠের কাজ

গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য অংশ বাঁশ-বেতের কাজ। কুষ্টিয়ার বহু পরিবার আজও বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করেন চাটাই, ঝুড়ি, দোলনা, পাটি, মাছ ধরার ফাঁদ, সাজসজ্জার সামগ্রী ইত্যাদি। কাঠের কারিগররাও কম যান না—তাঁরা তৈরি করেন পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, দরজা, ও শৈল্পিক খোদাই। এসব পণ্য শহরেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

নকশিকাঁথা ও অন্যান্য হস্তশিল্প

কুষ্টিয়ার নারীরা তাঁদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করেন সূচিশিল্পে। পুরোনো কাপড়ের ওপর রঙিন সুতোয় সেলাই করা নকশিকাঁথা আজও এখানকার গৃহস্থালির শোভা। পাশাপাশি কিছু এলাকায় নারীরা তৈরি করেন হাতে বোনা ব্যাগ, টেবিলকভার, বালিশের কভার ইত্যাদি—যা বর্তমানে অনলাইন বাজারেও বিক্রি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব

কুষ্টিয়ার হস্তশিল্প কেবল ঐতিহ্য নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণও বটে। বহু পরিবার, বিশেষ করে নারীরা, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বনির্ভর হয়েছেন। গ্রামের যুবকরাও এখন অনলাইনে তাঁদের তৈরি পণ্য বিক্রি করছেন দেশজুড়ে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ালে এই শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে।

ঐতিহ্য রক্ষার আহ্বান

আজকের যান্ত্রিক যুগে হাতে বানানো জিনিসের আবেদন হয়তো কমছে, কিন্তু তার সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক মূল্য চিরকাল অমলিন। কুষ্টিয়ার হস্তশিল্প সংরক্ষণ মানে শুধু পেশা রক্ষা নয়, বরং এক অমূল্য ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।

কুষ্টিয়ার হস্তশিল্প কেবল একটি পণ্য নয়, এটি মানুষের পরিশ্রম, সৃজন ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। মসলিন থেকে তাঁত, মাটি থেকে কাঠ—সবকিছুই এই জেলার ইতিহাসে বোনা আছে শিল্পের সোনালি সুতোয়। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা আমাদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।

কুষ্টিয়া বাংলাদেশের এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চল। একসময় এখানে মসলিন কাপড় তৈরি হতো, যা পরে তাঁত শিল্পে পরিণত হয়। এছাড়া মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেত, কাঠের কাজ ও নকশিকাঁথা এখানকার প্রধান হস্তশিল্প। এসব শিল্প স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে এবং সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখছে।

Comments

সংস্কৃতি এর নতুন প্রবন্ধ

সিলেট বিভাগের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ
সিলেট বিভাগের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ

সিলেট বিভাগের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ

  • Sub Title: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা
লালন মেলা – বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎসব
লালন মেলা – বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎসব

লালন মেলা – বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎসব

  • Sub Title: লালন মেলা শুধু একটি উৎসব নয়— এটি বাংলার লোকসংগীত, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক দর্শনের এক মিলনমেলা

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন