কার্তিক মাসের পূর্ণিমার রাতে, যখন নদী-সাগরের পাড়ে হাজারো প্রদীপ জ্বলে ওঠে আর বাঁশির সুরে রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা ফুটে ওঠে, তখন বাঙালি পালন করে রাস পূর্ণিমা—কার্তিক পূর্ণিমার বৈষ্ণব রূপ। শাস্ত্রের শারদরাস থেকে সুন্দরবনের দুবলার চরের শতবর্ষী রাসমেলা, নবদ্বীপের শাক্তরাস থেকে মণিপুরের রাসনৃত্য—রাস পূর্ণিমা বাংলা ও বাঙালির এক বিস্তৃত উৎসব-ঐতিহ্যের নাম।
রাস মূলত শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত একটি ধর্মীয় উৎসব; আর সেই উৎসবের প্রধান তারিখটি পড়ে কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে—তাই এই দিনটি রাস পূর্ণিমা নামে পরিচিত। বাংলায় 'রাস পূর্ণিমা' ও 'কার্তিক পূর্ণিমা' প্রায় পাশাপাশি চলে: পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় দৈনিকগুলোও "কার্তিক পূর্ণিমার আর এক নাম রাস পূর্ণিমা" লিখে দিনটিকে চিহ্নিত করে। এই দিনে মন্দির-প্রাঙ্গণ ও নদী-সৈকতের পাড়ে প্রদীপ জ্বালানোর প্রথাও প্রচলিত।
২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী রাস পূর্ণিমা পড়ছে ২৪ নভেম্বর। কার্তিক মাস তখন শেষ প্রহরে—রাখের উপবাস, আকাশপ্রদীপ আর মাস-ব্যাপী ব্রতের ধারাবাহিকতার শেষ প্রান্তে এই পূর্ণিমাটিই মাসটিকে সামান্য করে হয়।
১. শাস্ত্রে রাস: ভাগবতের শারদরাস থেকে রাসলীলা
রাসের মূল বর্ণনা পাওয়া যায় পুরাণে। শ্রীমদ্ভাগবত ও বিষ্ণুপুরাণে শুধু শারদরাসের বর্ণনা আছে, আর পদ্মপুরাণে শারদরাস ও বাসন্তীরাস—দুই ধরনের রাসেরই উল্লেখ মেলে। হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্করের ব্যাখ্যায় রাস হলো এক ধরনের বৃত্তাকার নৃত্য, যা আট, ষোলো বা বত্রিশজন সম্মিলিতভাবে পরিবেশন করতে পারেন।
বাংলার বৈষ্ণব ঐতিহ্যে এই রাস লীলা-কাব্য ও যাত্রাপালার রূপ নেয়—রাধা ও কৃষ্ণের মাঝে গোপিনীবৃন্দের সঙ্গে চলা বৃত্তাকার নৃত্যের আখ্যানই রাসলীলা। কাজেই রাস পূর্ণিমা কেবল ধর্মীয় তিথি নয়; এটি নৃত্য-সংগীত-যাত্রাপালার এক লোকশিল্প-উৎসবও।
২. বঙ্গে রাস: নবদ্বীপের শাক্তরাস থেকে মণিপুরের রাসনৃত্য
বাংলায় রাস উৎসবের সবচেয়ে বিখ্যাত ঠিকানা নদীয়ার নবদ্বীপ—যেখানে রাসযাত্রা বৈষ্ণব ঐতিহ্য ছাড়িয়ে শাক্ত উপাসনার রূপও নিয়েছে (নবদ্বীপের শাক্তরাস), আর শান্তিপুরের ভঙ্গারাস আলাদা পরিচিতি নিয়ে পালিত হয়। মথুরা-বৃন্দাবনের ব্রজ ছাড়াও ওড়িশা, আসাম ও মণিপুরে রাসযাত্রা বিশেষভাবে উদযাপিত হয়; মণিপুরের রাসলীলা আজ শাস্ত্রীয় মণিপুরি নৃত্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ—অঞ্চলভেদে কথ্যক, ওড়িশি, মণিপুরি ঘরানার নৃত্যে রাসনৃত্য বিশেষ মর্যাদা পায়।

নবদ্বীপ শাক্তরাস উৎসবের দৃশ্য (ছবি: বাক্যবাগীশ / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)
৩. দুবলার চরের রাস উৎসব ও শতবর্ষী রাসমেলা
বাংলাদেশে রাস পূর্ণিমার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ঠিকানা সুন্দরবনের দুবলার চর। প্রতি বছর কার্তিক মাসে (নভেম্বরে) রাসমেলা ও পুণ্যস্নানের জন্য এই সামুদ্রিক দ্বীপটি বিখ্যাত—লোকমুখে মেলার বয়স দুই শ বছর বলা হয়; তবে জানা যায়, ১৯২৩ সালে হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত হরিভজন (১৮২৯–১৯২৩) এই মেলা চালু করেন। তিনদিনব্যাপী এই উৎসবে রাসপূর্ণিমাকে উপলক্ষ করে অসংখ্য পুণ্যার্থী সমুদ্রস্নান করতে আসেন; সূর্যোদয়ে ভক্তরা সমুদ্রের জলে ফল ভাসিয়ে দেন, আর বাদ্যযন্ত্রের তালে ভজন-কীর্তনে মুখরিত হয় চারপাশ। দূর-দূরান্তের শহরবাসী এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০২৪–২০২৬) মেলার আনুষ্ঠানিক আয়োজন স্থগিত রাখা হচ্ছে—জাতীয় দৈনিকগুলোতে ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরও "দুবলার চরে এবারও হচ্ছে না রাসমেলা" শিরোনামে খবর এসেছে। তবু রাস উৎসব ও ভক্তদের সমাবেশ চলছে—দুবলার চরের এই শতবর্ষী ঐতিহ্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আমাদের আলাদা প্রবন্ধে আছে।

দুবলার চরের কাছে সুন্দরবনের দৃশ্য (ছবি: Fuadctg009 / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)
৪. কুয়াকাটা ও দেশের অন্যান্য রাস-উদযাপন
দুবলার চর ছাড়াও বাংলাদেশের আরেক বিখ্যাত রাস-ঠিকানা পটুয়াখালীর কুয়াকাটা—সমুদ্রসৈকতের পাড়ে এখানেও বার্ষিক রাস উৎসব হয়; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ৪ নভেম্বর থেকে কুয়াকাটায় রাস উৎসব শুরুর খবর এসেছিল। দেশের নানা মন্দির-প্রাঙ্গণেও রাস পূর্ণিমায় রাসলীলা পরিবেশন ও প্রদীপ জ্বালানোর আয়োজন হয়।
৫. রাখের উপবাস থেকে রাস পূর্ণিমা: এক কার্তিকের উৎসব-জোয়ার
কার্তিক মাস বাংলার উৎসব-দিনপঞ্জির অন্যতম ঘন মাস। মাসের শনি ও মঙ্গলবারগুলোতে রাখের উপবাস, পুরো মাসজুড়ে আকাশপ্রদীপ ও কার্তিক-ব্রত, মাঝে নবান্ন—আর শেষ প্রহরে রাস পূর্ণিমা। ২০২৬ সালে ধারাটি পড়ছে এমন: রাখের উপবাস ৩/৭/১০/১৪ নভেম্বর (মঙ্গল ও শনিবার), নবান্ন ১৬ নভেম্বর (পয়লা অগ্রহায়ণ), রাস পূর্ণিমা ২৪ নভেম্বর। এই এক মাসই বাংলার প্রদীপ-ঐতিহ্য, কৃষি-উৎসব আর ভক্তি-পরম্পরাকে একসূত্রে গাঁথে।
৬. কেন রাস পূর্ণিমা এখনও গুরুত্বপূর্ণ
রাস পূর্ণিমা তিনটি ধারাকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে: শাস্ত্রীয় পরম্পরা (ভাগবতের শারদরাস), লোকশিল্প (রাসলীলা, যাত্রাপালা, মণিপুরি নৃত্য) আর জনজীবনের উৎসব (দুবলার চর ও কুয়াকাটার সমাবেশ)। মেলার আনুষ্ঠানিক আয়োজন থমকে গেলেও ভক্তদের সমাবেশ ও নৃত্য-গীতির পরম্পরা বেঁচে আছে—এবং পূর্ণিমার রাতের প্রদীপটুকুই এই ঐতিহ্যের চিরন্তন স্মারক।
বাংলা
English