“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

শিশু সংগঠক, লেখক ও সাংবাদিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই
শিশু সংগঠক, লেখক ও সাংবাদিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই

রোকনুজ্জামান খান (জন্মঃ ৯ এপ্রিল, ১৯২৫ - মৃত্যুঃ ৩ ডিসেম্বর, ১৯৯৯) বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও সংগঠক ছিলেন। দাদাভাই নামেই সম্যক পরিচিত ছিলেন তিনি। ছেলেবুড়ো সবার প্রিয় দাদা ভাই রোকনুজ্জামান খান ১৯২৫ সালের ০৯ এপ্রিল রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায় সাহিত্য-সংস্কৃতিসমৃদ্ধ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং অনুরূপ পরিমন্ডলেই তাঁর জীবন অতিবাহিত হয় ৷ দাদাভাইয়ের আসল বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার ভবানীপুর গ্রামে।

সেকালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সম্পাদক রওশন আলী চৌধুরী ও এয়াকুব আলী চৌধুরীর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা ছিলেন দাদাভাইয়ের নানা। তাঁর পিতার নাম মৌলভী মোখাইর উদ্দীন খান। শৈশবে মাকে হারিয়ে নানা বাড়িতে তিনি বড় হন এবং পাংশা জর্জ স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি কলকাতা চলে যান।

রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই ১৯৪৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন কলকাতার দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে। ১৯৪৮ সালে আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত ইত্তেহাদ পত্রিকার 'মিতালী মজলিস' নামীয় শিশু বিভাগের দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে শিশু সওগাত পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে দৈনিক মিল্লাতের কিশোর দুনিয়া'র শিশু বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ১৯৫৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় যোগ দিয়ে তরুণ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং তিনি মৃত্যুর আগমূহুর্ত পর্যন্ত এই পত্রিকায় কাজ করেন। ২রা এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় শিশু-কিশোরদের উপযোগী কচিকাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক নিযুক্ত হন এবং আসর পরিচালকের নামকরণ করা হয় দাদাভাই। সেই থেকে তিনি নতুন পরিচয় পান দাদাভাই। তাঁর পরিচিতিতেই ছোটদের উপযোগী করে এই পত্রিকায় লিখতেন সুফিয়া কামাল, আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিন, শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফয়েজ আহমেদ, হোসনে আরা, নাসির আলী, হাবীবুর রহমানসহ বিখ্যাত অনেক লেখক। দৈনিক ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিরলসভাবে আমৃত্যু কাজ করেছেন।

এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ‘কচি কাঁচা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৬৫ সালে তাঁর হাতে গড়া কঁচি-কাঁচার মেলা আজ বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ শিশু-কিশোর সংগঠন। আমৃত্যু তিনি সন্তানের মতো সংগঠনটিকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন । শিশুরা সেরা মানব সম্পদ, শিশুরা স্বর্গের দেবদূত। এদের মানুষ গড়ার কারিগর এই দাদাভাই। শৈশব থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিলো শিশুদের জন্য একটি স্বর্গ-উদ্যান তৈরি করা। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সে স্বপ্ন সফল হয়েছে বলতে হবে। হাজারো সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূল অবস্থার মধ্য থেকে সেই রূপালী স্বপ্ন সফল করে তোলা কঠিন ব্যাপার। দাদাভাই এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিরলসভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, লাখো লাখো শিশু-কিশোরকে স্বর্গের আলোকে আলোকিত করেছেন।

তাঁর মতো একজন দক্ষ ও শিশু দরদী মানুষ এদেশে কম জন্মগ্রহণ করেছেন। সারাটি জীবন তিনি শিশুদের নিয়েই চিন্তাভাবনা করেছেন। তাঁর হাতে গড়া শিশুরা আজ জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। আমৃত্যু তিনি আগামী দিনের শিশুদের নিয়ে চিন্তা করেছেন। আজকের বাংলাদেশ শিশু একাডেমী তাঁরই প্রস্তাবে গড়া। দাদাভাই কচিকাঁচার মেলা ব্যতীত বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি, শিশু একাডেমী, শিশু কল্যাণ পরিষদ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

রোকনুজ্জামান নিজে অনেক কবিতা ও ছড়া লিখেছেন এবং শিশুদের লেখা সংশোধন ও সম্পাদনা করে পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন ৷ শিশুদের চিত্তবুত্তির উন্মেষ ও প্রতিভার বিকাশে তিনি নিরলসন প্রয়াস চালিয়েছেন ৷

"বাক বাকুম পায়রা, মাথায় দিয়ে টায়রা
বউ সাজবে কাল কি, চড়বে সোনার পালকি"

তাঁর অসামান্য শিশুতোষ ছড়া হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হাট্টিমাটিম টিম, খোকন খোকন ডাক পাড়ি, আজব হলেও গুজব নয় প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর সম্পাদিত ঝিকিমিকি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিশুসংকলন ৷ এসব রচনার মাধ্যমে তিনি কোমলমতি শিশুদের মনে নীতিজ্ঞান, দেশপ্রেম ও চারিত্রিক গুণাবলি জাগ্রত করার চেষ্টা করেন ৷ এছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন - আমার প্রথম লেখা, বার্ষিক কচি ও কাঁচা, ছোটদের আবৃত্তি ইত্যাদি পুস্তক।

পারিবারিক জীবনে দাদাভাই ছিলেন দুই কন্যা সন্তানের জনক। তার স্ত্রী বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নারী ব্যাক্তিত্ব ‘বেগম’ সম্পাদক নূরজাহান বেগম, যিনি দেশের সকলের কাছে সুপরিচিত। তাঁর শ্বশুর সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ছিলেন প্রখ্যাতজন।

সৃজনশীল ও সাংগঠনিক কর্মের পুরস্কারস্বরূপ রোকনুজ্জামান খান বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), শিশু একাডেমী পুরস্কার (১৯৯৪), একুশে পদক (১৯৯৮), জসীমউদ্দীন স্বর্ণপদক এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ও রোটারি ফাউন্ডেশন ট্রাস্টির পল হ্যারিস ফেলো সম্মানে ভুষিত হন ৷ দাদা ভাই। শিশু সংগঠনে অসামান্য অবদান রাখায় রোকনুজ্জামান খান ২০০০ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (মরনোত্তর) ভূষিত হন।

ছোটদের প্রিয় রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ১৯৯৯ সালের ০৩ ডিসেম্বর সবাইকে ছেড়ে চলে যান সেই অচেনা এক দেশে। যে দেশ থেকে কেউই আর কখনই ফেরে না। কিন্তু তিনি চলে গেলেও তার অবদানের কথা মনে রাখবে সবাই।

Add comment
Posting any form of obscene comment is prohibited; doing so will result in legal action.

সংস্কৃতি এর নতুন প্রবন্ধ

লালন মেলা – বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎসব
লালন মেলা – বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎসব

লালন মেলা – বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উৎসব

  • Sub Title: লালন মেলা শুধু একটি উৎসব নয়— এটি বাংলার লোকসংগীত, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক দর্শনের এক মিলনমেলা

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন