বাংলাদেশের সঙ্গীতে লালন গান একটি বিশেষ অবস্থান দখল করে আছে — মানবতা, ভক্তি, সমাজবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম ভাবনা ও সার্বভৌম অনুভূতির মিথ।
ফরিদা পারভীন ছিলেন সেই পথে স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি লালন গানের রহস্য ও গভীরতা তাঁর কণ্ঠে তুলে ধরেছেন এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন।
শৈশব ও জন্ম
- ফরিদা পারভীন জন্মগ্রহণ করেন ৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৪-এ (নাটোর জেলার সিংড়া থানার শাঔঁল গ্রামে)
- শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল — হরমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন, পার্শ্ববর্তী সমাজের সঙ্গীতপ্রেমীদের সঙ্গে গানের মেলবন্ধনে অংশ নিতেন
- পরিবারের উৎসাহ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাঁকে সঙ্গীতের দিকে ধাক্কা দিয়েছিল
সঙ্গীত যাত্রা
- প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ও ভাবময় রূপান্তর
- প্রথমে তিনি ক্ল্যাসিকাল ও নজরুল সঙ্গীত শিখেছিলেন — অধ্যায়ন করেছেন অনেক ustad-দের কাছ থেকে
- ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুল গায়ক হিসেবে যুক্ত হন
- পরে মকসেদ আলী শাহ্ (Moksed Ali Shai) তাঁকে লালন গানের পথে পরিচালিত করেন
- লালন গানে অভ্যুত্থান
- “সত্য বল সুপথে চল” তাঁর একটি খুব জনপ্রিয় লালন গান, যার মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান
- অন্যান্য বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে — “তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদের নাম”, “নিন্দার কাঁটা যদি” ইত্যাদি
- বিদেশেও তিনি লালন গানের মর্ম প্রচার করেছেন — ইউরোপ, আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর সঙ্গীত পরিবেশন হয়েছে
- অন্যান্য সঙ্গীত ও কাজ
- চলচ্চিত্রে গানের মাধ্যমেও তিনি অংশ নিয়েছেন এবং “অন্ধ প্রেম” ছবির জন্য সেরা মেয়ে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন
- লালন গানের সঠিক রূপ সংরক্ষণ এবং প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়া – এই উদ্দেশ্যে তিনি কাজ করেছেন, একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন
ব্যক্তিগত জীবন
- প্রথম স্বামীর নাম আবু জাফর, পরে তিনি গাজী আব্দুল হকিম নামের ফ্লুট শিল্পীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন
- দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলে
মৃত্যু ও সমুদ্র
- ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি নিয়মিত ডায়ালাইসিসের জন্য ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ভর্তি হন
- পরবর্তী সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে, ১০ সেপ্টেম্বর তাঁকে যন্ত্রসাহায্যে রাখা হয়
- অবশেষে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রাত ১০:১৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন
- তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেশের সাংস্কৃতিক ও জনসাধারণের মধ্যে গভীর শোক ছড়িয়ে দেয়
- তাঁর শেষ জানাজা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়, এরপর তাঁর মরদেহ কুষ্টিয়ায় নেওয়া হয় এবং কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়
অগ্রগণ্য সম্মান ও পুরস্কার
- একুশে পদক (১৯৮৭)
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা মেয়ে প্লেব্যাক সিঙ্গার, ১৯৯৩)
- ফুকুওকা এশিয়ান কালচার পুরস্কার (২০০৮)
- অন্যান্য বহু সম্মাননা ও স্বীকৃতি
অবদান ও ধারা
- ফরিদা পারভীন শুধু একজন গায়িকা ছিলেন না — তিনি ছিলেন লালন গানের জীবন্ত প্রতিনিধি।
- তাঁর কণ্ঠে লালন গানের মূল ভাব ও আধ্যাত্মিক দর্শন শ্রোতাজনকে পৌঁছেছে — ভালোবাসা, বিশ্বাস, মানবতা ও দুঃখের কথা তাঁর গানে ফুটে উঠেছে।
- নতুন প্রজন্মের গায়ক ও গায়িকাদের জন্য তিনি অনুপ্রেরণা।
- তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ শিল্প সংস্কৃতির একটি অতুলনীয় গুণ হারালো — তবে তাঁর রচিত সুর ও বক্তব্য জীবিত থাকবে।
ফরিদা পারভীনের জীবনের গল্প আমাদের শেখায় — সঙ্গীত শুধু বিনোদন নয়, এক আলোর দিশারি, মানুষের অন্তরাভিলাষ ও অনুভবের প্রতিফলন।
যেখানে জীবন এবং দায়িত্বের মাঝে যন্ত্রণায় ও আনন্দে সঙ্গী হয় সুর, সেখানে ফরিদা পারভীন তাঁর গানে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

Comments