“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি… আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে তাকওয়াবান।” — সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩

Select your language

কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি
কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি
  • Sub Title: প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এক ধারাবাহিক ইতিহাস

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কুষ্টিয়া একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই অঞ্চল শুধু সাংস্কৃতিকসাহিত্যিক ঐতিহ্যের জন্যই নয়, বরং রাজনৈতিক চেতনা, আন্দোলন ও গণঅংশগ্রহণের ক্ষেত্র হিসেবেও সুপরিচিত। প্রাচীন রাজ্যব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তান আমলের গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কুষ্টিয়ার ভূমিকা সবসময়ই ছিল সক্রিয় ও প্রভাবশালী।

কুষ্টিয়ার মানুষ রাজনীতি মানে শুধু দলীয় কার্যক্রম নয়—তারা রাজনীতিকে দেখেছে মুক্তচিন্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে।

এই প্রবন্ধে আমরা কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ তুলে ধরব—প্রাচীন রাজ্য থেকে আধুনিক গণতন্ত্র পর্যন্ত এক দীর্ঘ পথচলার কাহিনি।

উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব

এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করা এবং এর মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মকে অতীতের রাজনৈতিক চেতনা সম্পর্কে অবহিত করা।

রাজনীতির ইতিহাস জানলে সমাজ পরিবর্তনের ধারা বোঝা যায়। তাই কুষ্টিয়ার প্রাচীন রাজনীতি থেকে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত জানা শুধু ইতিহাস নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশেও ভূমিকা রাখে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগ

কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। এটি এক সময় গৌড়, পুন্ড্রবর্ধন ও পরে সেন রাজাদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন রাজনীতি ছিল রাজতান্ত্রিক ও ধর্মনির্ভর। জনগণ রাজা বা স্থানীয় জমিদারের অধীনে জীবনযাপন করত।

পাল ও সেন যুগে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব সমাজ ও রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে সরাসরি অংশ না নিলেও তাদের জীবন ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার অধীন ছিল।

মোগল ও নবাব আমল

১৬শ থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত কুষ্টিয়া মোগল শাসনাধীন নদীয়া জেলার অংশ ছিল। এই সময়ে রাজনীতি মূলত প্রশাসনিক ও রাজস্ব সংগ্রহ কেন্দ্রিক ছিল। কয়া, মিরপুর ও খোকসা অঞ্চলে জমিদার শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

এই সময় থেকেই স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রজাদের মধ্যে আনুগত্য ও বিরোধের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশ পেতে শুরু করে।

ব্রিটিশ আমল

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শাসন শুরু হলে কুষ্টিয়া রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫), স্বরাজ আন্দোলন, ও স্বাধীনতা সংগ্রামে কুষ্টিয়ার মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

এই সময় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়

কুষ্টিয়ার বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিকদের মধ্যে অনেকে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।

পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭১)

এই সময় কুষ্টিয়ার রাজনীতি ছিল আন্দোলন ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ। মুসলিম লীগের প্রভাবে মুসলিম জনসাধারণ রাজনীতিতে যুক্ত হলেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ার ছাত্র ও তরুণরা কেন্দ্রীয় আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী দলগুলো কুষ্টিয়ায় সক্রিয় হয়।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া জেলা ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে—এখানেই প্রথম বিদ্রোহী প্রশাসন গঠিত হয়, যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রশাসনিক কাঠামো

স্বাধীন বাংলাদেশ (১৯৭১–বর্তমান)

স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়া জাতীয় রাজনীতির মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠে।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি এখানে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সংসদ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া ছাত্ররাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে।

সমসাময়িক রাজনীতি

বর্তমান সময়ে কুষ্টিয়ার রাজনীতি উন্নয়ন, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক পরিবর্তন নির্ভর হয়ে উঠেছে

তরুণ সমাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করছে এবং স্থানীয় উন্নয়ন ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে

আজকের কুষ্টিয়া রাজনৈতিকভাবে সচেতন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি সময়ের সঙ্গে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে, জমিদারী প্রথা থেকে জনগণের শাসনে—এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কুষ্টিয়ার মানুষ বারবার দেখিয়েছে তাদের রাজনৈতিক চেতনা, সংগঠন দক্ষতা ও মুক্তচিন্তার শক্তি

আজও কুষ্টিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

Comments

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াস্থ লালন শাহের মাজারের হালচাল
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াস্থ লালন শাহের মাজারের হালচাল

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াস্থ লালন শাহের মাজারের হালচাল

  • Sub Title: স্বার্থান্বেসী মহলের ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকার, সত্যান্বেষণ এবং একটি পর্যালোচনা
ফকির লালন শাঁইজীর আঁখরা বাড়ি
ফকির লালন শাঁইজীর আঁখরা বাড়ি

লালন স্মরণোৎসব ২০২৫

  • Sub Title: শুধু মাত্র খেলাফতধারী বাউল ফকিরদের জন্য অনুষ্ঠান

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন