বাংলার ইতিহাসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এক অবিস্মরণীয় নেতা। তাঁকে “মজলুম জনতার নেতা” বলা হয়। যদিও তিনি পরবর্তীতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের জাতীয় নেতা হিসেবে পরিচিত হন, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল আসামে।
আসামের মাটি থেকেই তিনি জনগণের রাজনীতির পাঠ নেন এবং শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রামী হয়ে ওঠেন।
🌾 ১. আসামের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম ছিল পশ্চাদপদ একটি অঞ্চল, যেখানে মুসলমান জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ছিল কৃষক ও শ্রমজীবী। জমিদার, চা-বাগান মালিক ও ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁদের শোষণ করত। অন্যদিকে, পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে বহু দরিদ্র মুসলমান কৃষক আসামে এসে জমি চাষ শুরু করে। এদের অনেককে “বহিরাগত” বলে বৈষম্যের শিকার করা হতো।
এই প্রেক্ষাপটে মাওলানা ভাসানী জনগণের পাশে দাঁড়ান এবং তাঁদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেন।
✊ ২. কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আন্দোলন
মাওলানা ভাসানী আসামের মুসলমান কৃষক ও মজুরদের সংগঠিত করেন।
- তিনি জমিদারদের অন্যায় কর আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।
- কৃষকদের জমির অধিকার ও ন্যায্য মজুরির দাবি তোলেন।
- দরিদ্র কৃষকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে নানা আন্দোলন পরিচালনা করেন।
এই আন্দোলনের ফলেই তিনি “মজলুম জনতার নেতা” উপাধি পান এবং জনগণের গভীর ভালোবাসা অর্জন করেন।
🏛️ ৩. আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নেতৃত্ব
১৯৪৪ সালে মাওলানা ভাসানী আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে মুসলমানরা সংগঠিত হয় এবং আসামের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
- তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তোলেন।
- মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব (পাকিস্তান প্রস্তাব) জনগণের কাছে তুলে ধরেন।
- আসামকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের অংশ হিসেবে রাখার জন্য আন্দোলন করেন।
🚜 ৪. বাঙালি কৃষক ও অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা
ব্রিটিশ আমলে এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গ থেকে আসামে বহু মুসলমান কৃষক চলে আসে। স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী তাঁদের “বাঙালি অনুপ্রবেশকারী” বলে কটূক্তি করত।
মাওলানা ভাসানী এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন।
- তিনি বলেন, এরা ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদনেই বসতি স্থাপন করেছে, তাই এদের অধিকার কেড়ে নেওয়া অন্যায়।
- বাঙালি মুসলমানদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেন।
🕌 ৫. ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারে ভূমিকা
ভাসানী শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদও।
- তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেন।
- ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজন নয়, বরং মানবকল্যাণের পথ দেখান।
- তাঁর বক্তব্য ও জীবনযাপন ছিল সহজ-সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত।
⚖️ ৬. রাজনৈতিক দর্শন ও ‘ভাসানীবাদ’-এর ভিত্তি
আসামের অভিজ্ঞতাই তাঁকে জনগণের রাজনীতির পথে পরিচালিত করে। এখানেই তিনি বুঝতে পারেন—
“রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণ না আনে, তবে সেটি অর্থহীন।”
এই ভাবনা থেকেই পরবর্তীতে তাঁর “ভাসানীবাদ” বা জনগণের রাজনীতি বিকশিত হয়, যা পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছিল।
আসামের রাজনীতিতে মাওলানা ভাসানীর অবদান ছিল অসাধারণ।
তিনি মুসলমান কৃষক, মজুর ও বাঙালি অভিবাসীদের জীবন-সংগ্রামের মধ্য থেকে নেতৃত্বের শক্তি পেয়েছিলেন। তাঁর আন্দোলন আসামের মানুষকে যেমন অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছিল, তেমনি সমগ্র বাংলার মানুষের মধ্যেও জাগরণ সৃষ্টি করেছিল।
তাই ইতিহাসের বিচারে বলা যায় — মাওলানা ভাসানী ছিলেন আসামের জনগণের মুক্তির অগ্রদূত এবং বাংলার রাজনীতিতে জনগণের কণ্ঠস্বরের প্রতীক।

Comments