ইসলামী বর্ষপঞ্জির এক মহিমান্বিত রাত হলো শবে বরাত। ফারসি শব্দ ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। অর্থাৎ, শবে বরাত হলো এমন এক রাত—যে রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের জন্য ক্ষমা, রহমত ও মুক্তির দরজা উন্মুক্ত করে দেন। এই রাত মুসলমানদের আত্মসমালোচনা, তওবা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়।
শবে বরাতের ঐতিহাসিক ও হাদিসভিত্তিক প্রেক্ষাপট
শবে বরাত পালিত হয় শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে। এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
“এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আমার পাশে পাইনি। আমি খুঁজতে বের হলে জান্নাতুল বাকি‘তে তাঁকে সিজদারত অবস্থায় পেলাম। তখন তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের মধ্যরাতে (১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বনি কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করে দেন।’” — (সুনানে তিরমিজি: ৭৩৯; ইবনে মাজাহ: ১৩৮৯)
আরেক হাদিসে এসেছে—
“আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের মধ্যরাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” — (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়—এই রাত ক্ষমা ও রহমতের রাত হলেও, অন্তরের পবিত্রতা ও শিরকমুক্ত ঈমান এর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এই রাতের তাৎপর্য (কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে)
যদিও কোরআনে সরাসরি ‘শবে বরাত’ শব্দটি উল্লেখ নেই, তবে ক্ষমা, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির যে শিক্ষা কোরআন দেয়—তা এই রাতের মূল চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“হে মুমিনগণ! আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো।” — (সূরা আত-তাহরীম: ৮)
আরও বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” — (সূরা রা‘দ: ১১)
এই আয়াতগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো আত্মপরিবর্তন। তাই এই রাতের তাৎপর্য তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে—
- তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা: আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ফিরে আসা।
- অন্তরের পরিশুদ্ধতা: হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার বর্জন।
- ভবিষ্যতের জন্য সংকল্প: গুনাহ ত্যাগ করে সৎ পথে অবিচল থাকার অঙ্গীকার।
শবে বরাতে করণীয় আমল (প্রমাণভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি)
শবে বরাত উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আমল নেই। তবে সালাফে সালেহিন এই রাতকে নফল ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করতেন।
উত্তম আমলসমূহ হলো—
- নফল নামাজ: একাকী ও নিভৃতে আদায় করা উত্তম।
- কোরআন তিলাওয়াত: অন্তর পরিশুদ্ধ করার নিয়তে।
- জিকির ও ইস্তেগফার: বিশেষ করে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বেশি বেশি পড়া।
- দোয়া: নিজের, পরিবার ও পুরো উম্মাহর জন্য।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
“দোয়াই হলো ইবাদতের সারাংশ।” — (সুনানে তিরমিজি: ২৯৬৯)
এছাড়া হাদিসের আলোকে শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ছিল। — *(সহিহ বুখারি: ১৯৬৯; সহিহ মুসলিম: ১১৫৬)
যা থেকে বিরত থাকা উচিত
শবে বরাতের নামে কিছু প্রচলিত কাজ ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—
- আতশবাজি ফোটানো
- অপচয় ও লোকদেখানো আয়োজন
- ভিত্তিহীন রীতি ও কুসংস্কার
ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—ইবাদত হবে নিভৃতে, বিনয়ের সঙ্গে এবং আন্তরিকতায় ভরপুর।
সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা
শবে বরাত কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের রাত নয়; এটি সমাজের প্রতিও আমাদের দায়বদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যের প্রতি অন্যায় করে থাকলে ক্ষমা চাওয়া, সম্পর্কের জট খুলে দেওয়া এবং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার সংকল্প নেওয়াই এই রাতের প্রকৃত দাবি।
শবে বরাত আমাদের জীবনে নতুন করে ফিরে আসার এক সুবর্ণ সুযোগ। এই রাত যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে—বরং হোক আত্মসমালোচনা, তওবা ও পরিবর্তনের রাত। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সবাইকে এই রাতের পূর্ণ বরকত লাভ করার তৌফিক দান করেন। আমিন।

Comments