“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

লা তোমাতিনায় টমেটো-যুদ্ধের ভিড়
স্পেনের বুনিয়োলে লা তোমাতিনা উৎসবের টমেটো-যুদ্ধ (ছবি: flydime / Wikimedia Commons, CC BY-SA 2.0)
  • Sub Title: স্পেনের লা তোমাতিনা থেকে কলম্বিয়া ও আমেরিকা—টমেটো ঘিরে রঙিন উদ্‌যাপনের পূর্ণাঙ্গ গাইড

প্রতি বছর আগস্টের শেষ বুধবার স্পেনের ছোট্ট শহর বুনিয়োলের রাস্তা হয়ে যায় রক্তের মতো লাল—এক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৩০ টন পাকা টমেটো ছুঁড়ি মেরে শেষ হয় পৃথিবীর বৃহত্তম টমেটো-যুদ্ধ, লা তোমাতিনা। বৈজ্ঞানিকভাবে টমেটো ফল হলেও রান্নাঘরে সে সবজি, আর উৎসবের মাঠে নির্ভয়ে রাজা। শুধু স্পেন নয়—কলম্বিয়ার পাহাড়ি শহর সুতামারচান থেকে আমেরিকার 'টমেটোর জন্মস্থান' রেনল্ডসবার্গ পর্যন্ত বহু দেশে বহু সময়ে টমেটো ঘিরে বসে রঙিন আয়োজন, যেখানে টমেটো ছোঁড়া, রান্না-প্রতিযোগিতা আর মেলার হাজারো মানুষ মিশে যায় এক হাসির বিস্ফোরণে।

স্পেনের লা তোমাতিনা: পৃথিবীর বৃহত্তম টমেটো-যুদ্ধ

ভালেনসিয়া থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট শহর বুনিয়োল পৃথিবীমাপে বিখ্যাত হয়ে আছে একটার জন্যই—লা তোমাতিনা। প্রতি বছর আগস্টের শেষ বুধবার (২০২৬ সালে সেটি ২৬ আগস্ট) এই যুদ্ধ হয়। গল্পের শুরু ১৯৪৫ সালে: শহরের 'দৈত্য ও বড়মাথা' প্যারেডে হঠাৎ ঝগড়া বাঁধে, ধাক্কায় কারো বড়মাথার মুখোশ পড়ে যায়, রেগে গিয়ে রাস্তার সবজির দোকান থেকে টমেটো তুলে সবাই সবাকে ছুঁড়তে শুরু করে। পরের বছর ১৯৪৬-এ তরুণরা বাড়ি থেকে টমেটো আনিয়ে ইচ্ছে করেই যুদ্ধটা রেখে দেয়—সেখান থেকেই বার্ষিক ধারা।

উৎসবের পথ মসৃণ ছিল না। পঞ্চাশের দশকে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সরকার একে 'ধর্মীয় তাৎপর্যহীন' বলে নিষিদ্ধ করে, নিয়ম ভাঙা তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। ১৯৫৭ সালে বুনিয়োলের বাসিন্দারা পাল্টা জবাব দেন মজার প্রতিবাদে—বিশাল এক টমেটো কফিনে ভরে শোকসঙ্গীত বাজাতে বাজাতে 'টমেটোর শবাযাত্রা' বের করেন। সেই প্রতিবাদেই উৎসব পুনর্জীবিত হয় এবং পরে শহরের পৌরসভার আয়োজনে অফিসিয়াল মর্যাদা পায়। সাতচল্লিশের দশকে স্প্যানিশ টিভির সাংবাদিক হাভিয়ের বাসিলিওর প্রতিবেদনে গল্পটা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে, ২০০২ সালে লা তোমাতিনা স্পেনের 'আন্তর্জাতিক পর্যটন-আগ্রহের উৎসব' ঘোষণা পায়।

যুদ্ধের দিনটা কেমন কাটে

বুধবার আসার আগেই বুনিয়োল উৎসবের রঙে ভরে যায়—প্যায়েলা রান্নার প্রতিযোগিতা, আতশবাজি, প্যারেড, সঙ্গীত। যুদ্ধের সকালে প্রথম খেলা হয় 'পালো হাবোন'-এর: সাবান-লাগানো মসৃণ খুঁটির ওপরে বাঁধা থাকে শুয়োরের হাঁ (হামোন), আর মানুষ একে ওপরে উঠে সেটি নামাতে চেষ্টা করে। হাঁ পড়ে গেলে বা নির্দিষ্ট সময়ে কামানের গর্জনে যুদ্ধ শুরু—বিশাল ট্রাক থেকে টমেটো রাস্তায় ঝরে পড়ে, প্রায় এক ঘণ্টা চলে আমেজ, তারপর দ্বিতীয় কামানের শব্দেই সবকিছু থেমে যায়। এরপর ফায়ার-ট্রাক নামিয়ে রাস্তা ধুয়ে দেওয়া হয়, বাসিন্দারা তাদের বাড়ির পানির পাইপ ধরিয়ে দেন, আর টমেটোর সাইট্রিক অ্যাসিড নিজেই পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে—কোনো কোনো পৃষ্ঠ তো আগের চেয়েও ঝকঝকে হয়ে যায়!

টমেটোর রসে মাখা অংশগ্রহণকারী

টমেটোর রসে ভেজা এক অংশগ্রহণকারী (ছবি: flydime / Wikimedia Commons, CC BY-SA 2.0)

২০১৩ সাল থেকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২০ হাজারে সীমিত করা হয়েছে—নয় হাজার মানুষের শহরে আর বেশি ভিড় সামলানো যায় না, তাই টিকিট আগেই কিনতে হয়। ২০২০ ও ২০২১ সালে কোভিডে উৎসব বাতিল হয়েছিল; ২০২৫ সালে ৮০ বছর পূর্তিতে ২২ হাজারের বেশি মানুষ যোগ দেয়। ২০১৩ সালে ২০ হাজার মানুষের হাতে গিয়েছিল প্রায় ১৩০ টন টমেটো, ২০১৫ সালের হিসাব প্রায় ১৪৫ টন। নিয়ম পড়া-শোনা ছোট: শুধু টমেটোই ছোঁড়া যাবে, তবে ছোঁড়ার আগে হাতে চাপা দিয়ে নরম করতে হবে; কারো জামাকাপড় ছিঁড়বে না; ট্রাকের থেকে দূরে থাকবেন; দ্বিতীয় কামানের পরে বন্ধ; নিরাপত্তা-কর্মীদের কথা শুনবেন।

কলম্বিয়ার সুতামারচান: জুনের টমেটিনা

স্পেনের গল্পটা এত বিখ্যাত যে তার ছায়া পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকাতেও। কলম্বিয়ার বয়াকা প্রদেশের পাহাড়ি শহর সুতামারচানে ২০০৪ সালের ১৫ জুন থেকে শুরু হয়েছে নিজস্ব টমেটিনা—প্রতি বছর জুনের মাঝামাঝি এই উৎসব বসে, যেখানে লা তোমাতিনার মতোই টমেটো-যুদ্ধের আসর বসে। সসেজ-খ্যাত শহরটিতে টমেটোর রস ছিটিয়ে খেলার পাশাপাশি মেলে লম্বানিজা সসেজ, আঞ্চলিক খাবার আর লোকসঙ্গীতের আসর। বছরের প্রথমার্ধে টমেটো-উৎসব ঘুরতে চাইলে এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় ঠিকানা।

আমেরিকায় টমেটো-উৎসব

আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের রেনল্ডসবার্গ শহরের ডাকনাম 'টমেটোর জন্মস্থান'—১৯ শতকে অ্যালেক্সান্ডার ডব্লিউ লিভিংস্টন এখানেই প্রথম বাণিজ্যিক টমেটো-জাত উদ্ভাবন করেন, তাঁর বাড়িটি আজও জাদুঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই শহর ১৯৬৫ সাল থেকে প্রতি বছর আগস্টে টমেটো ফেস্টিভাল বসায়, যেখানে টমেটো-খাবারের মেলা, প্যারেড আর 'টমেটো ফেস্টিভাল কুইন'-এর প্রতিযোগিতা থাকে। এখানে টমেটো ছোঁড়া হয় না—বরং টমেটো দিয়ে রান্না করে, টমেটোর ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে মেলা বসে; টমেটো-উৎসবের দুই মুখ এটাই।

টমেটো-উৎসবে কী কী থাকে

যেখানেই টমেটোর উৎসব, সেখানেই কমবেশি তিনটি জিনিস মেলে। এক: খাবার—প্যায়েলা, সালসা, সস, পিজ্জা সস থেকে সরাসরি টমেটো-সালাদ, রান্না-প্রতিযোগিতা থাকেই। দুই: সঙ্গীত ও প্যারেড—বুনিয়োলের উৎসবসপ্তাহ জুড়ে থাকে ব্যান্ড, আতশবাজি আর রাস্তার নাচ। তিন: অবশ্যই টমেটো নিজে—কেউ ছোঁড়ে, কেউ রান্নার পাত্রে, কেউ শোভাযাত্রার শোভা। টমেটো-উৎসব আসলে এক অদ্ভুত সামাজিক মজলিশ: সবাই রসে-রসে একাকার হয়ে গেলে ধনী-গরিব, বয়স-বর্ণ সব সীমানা গলে যায়।

কখন কোথায়

সময়সূচি মনে রাখা সহজ। লা তোমাতিনা—স্পেনের বুনিয়োলে আগস্টের শেষ বুধবার (২০২৬ সালে ২৬ আগস্ট)। সুতামারচান—কলম্বিয়ায় জুনের মাঝামাঝি। রেনল্ডসবার্গ—আমেরিকার ওহাইওয়ে আগস্ট মাসে। অর্থাৎ জুনে কলম্বিয়া, আগস্টে ইউরোপ ও আমেরিকা—বছরের দ্বিতীয়ার্ধজুড়ে টমেটোর উৎসবের সময়রেখা ছড়িয়ে আছে।

যোগ দিতে চাইলে যা মনে রাখবেন

লা তোমাতিনায় যোগ দিতে চাইলে টিকিট সরকারি সাইট থেকে আগেই কিনে ফেলুন—২০ হাজারের সীমা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। পোশাক রাখুন সাদা (রসে লাল হয়ে যাওয়াই নিয়ম), সঙ্গে গগলস বা সানগ্লাস আর বাড়তি পোশাক। ফোন রাখুন পানিরোধী প্লাস্টিকের ব্যাগে। থাকার জন্য বুনিয়োলের হোটেল সীমিত, তাই বেশিরভাগ পর্যটক থাকেন ৪০ কিলোমিটার দূরের ভালেনসিয়ায়—সকালে ট্রেনে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসা যায়। সুতামারচানে যেতে হলে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকে বাসে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ।

টমেটোর পুকুরে ভাসছেন অংশগ্রহণকারী

টমেটোর রসের পুকুরে ভাসছেন এক অংশগ্রহণকারী (ছবি: flydime / Wikimedia Commons, CC BY-SA 2.0)

বাংলাদেশে টমেটোর জায়গা

টমেটো-যুদ্ধ হয় বুনিয়োলে, কিন্তু টমেটোর সঙ্গে আমাদেরও নিবিড় সম্পর্ক আছে। শীত এলেই বাংলাদেশের হাটবাজার ভরে যায় লাল টমেটোতে—শীত এই ফলটির মৌসুম, আর ওই সময়ে টমেটো বাঙালির খাওয়া-দাওয়ার অন্যতম প্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে। কাঁচা টমেটো নুন-মরিচ দিয়ে খেলে ঠোঁটে জল আসে, বোরহানির সঙ্গী টক টমেটোর চাটনি বিয়েবাড়ির ভোজে অবধারিত, আর টমেটো ভর্তা—সরিষার তেলে ঘাঁটা ধোঁয়া-ওঠা এই ভর্তাটা শীতের ভাতের সবচেয়ে প্রিয় ঝাল-মুখর সঙ্গীদের একটি। রান্নার দুনিয়ায় তো টমেটো অবিচ্ছেদ্য—বিরিয়ানি-কোরমা থেকে পাস্তা-পিৎজার সস, বাজারের ক্যাচাপ পর্যন্ত সবকিছুর ভিত টমেটো। তাই বাংলাদেশের কৃষকের কাছে টমেটো এখন লাভজনক ফসল—শীতে দেশের উত্তরাঞ্চলে টমেটোর আবাদ হয় ব্যাপকভাবে।

বাংলাদেশে টমেটো-উৎসব কীভাবে পালন করা যায়

বুনিয়োলের টমেটো-ছোঁড়াছোঁড়ি আমাদের জন্য নয়—খাদ্য-অপচয় এই দেশে কেউ চায় না। বরং বাংলাদেশে টমেটো-উৎসব হলে সেটি হবে রান্না আর চাষের উৎসব। স্কুল-কলেজে টমেটো-দিবস বসানো যায় শীতের মৌসুমে (ডিসেম্বর–জানুয়ারি): সেরা টমেটোর চাটনি, স্যালাড আর সসের রান্না-প্রতিযোগিতা, বৃহত্তম টমেটোর প্রতিযোগিতা, আর ছোটদের জন্য টমেটো-চিত্রকর্ম। পরিবারে শীতের এক দুপুরে 'টমেটো থালা' বসানো যায়—একই টমেটো দিয়ে ভর্তা, চাটনি, স্যালাড আর ঝোল, প্রতিটি পদের স্বাদ চিনে নেওয়ার খেলা। হাট-মেলায় বৃহত্তম টমেটো প্রদর্শনী, সেরা-চাষির পুরস্কার আর চারা-বীজের স্টল বসালে উৎসবটি কৃষকদের মেলাও হয়ে ওঠে। অর্থাৎ টমেটোর উৎসব বাংলাদেশে শুরু করতে চাইলে নিয়মটা একটাই—টমেটো ছোঁড়ার জায়গায় টমেটো খাওয়াই আমাদের পথ।

শেষ কথা

একটা সাধারণ সবজি-ফলকে নিয়ে পৃথিবীর কত শহর কত রকম উৎসব বানিয়েছে—ভাবলে অবাক লাগে। বুনিয়োলে টমেটো হলো মুক্তির বিস্ফোরণ, সুতামারচানে পরিচিতির মুক্তো, রেনল্ডসবার্গে ঐতিহ্যের স্মরণ। এক ঘণ্টার টমেটো-বৃষ্টি শেষে ধুয়ে-মুছে বাড়ি ফেরা মানুষগুলো বহন করে আসেন একটাই জিনিস—চিরচেনা অপরিচিতদের সঙ্গে একসঙ্গে হাসার স্মৃতি। টমেটোর উৎসব তাই আসলে মানুষের উৎসব।

Add comment
কোন প্রকার অশ্লীল কমেন্ট করা যাবে না, করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত আরো তথ্য

বিশ্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যর তথ্য

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন