“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

A roasted turkey, the centrepiece of a Thanksgiving dinner
A roasted turkey — the centrepiece of the Thanksgiving table (Image: slgckgc / Wikimedia Commons, CC BY 2.0)
  • Sub Title: ১৬২১ সালের ফসলের ভোজ থেকে আজকের বিলিয়ন-ডলারের অনলাইন ডিল

প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে দুটো ভিন্ন ধরনের উৎসবে বেঁধে যায় — একটি পরিবারের প্রিয় মানুষদের নিয়ে ভরা টেবিলে বসার থ্যাংকসগিভিং, আরেকটি ঠিক তার পরদিন ভোররাত থেকেই দোকানের দরজায় লাইন লাগানোর ব্ল্যাক ফ্রাইডে। ২০২৬ সালে থ্যাংকসগিভিং বৃহস্পতিবার ২৬ নভেম্বর, আর তার পরদিন শুক্রবার ২৭ নভেম্বরই ব্ল্যাক ফ্রাইডে। ছুটি আর শপিং-ধারা এমন ঘনিষ্ঠ জোড়া বলে মনে হয়, অথচ এর পেছনে চার শতাব্দীর ইতিহাস, রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশের এক লম্বা গল্প আছে।

থ্যাংকসগিভিং কী, আর কবে?

থ্যাংকসগিভিং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ছুটি — ফসলের মৌসুমের সমাপ্তিতে বছরের আশীর্বাদের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানোর এক পারিবারিক উৎসব। তারিখ নির্ধারণের নিয়মটি সহজ: নভেম্বর মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার। এই নিয়ম আইনে বসেছে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে, তার আগে দিনটির তারিখ নিয়ে বেশ মতোভেদ চলত। হিসেব করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালে থ্যাংকসগিভিং পড়ছে বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর। এই নিয়মে ছুটির তারিখ কখনো ২২ নভেম্বরের আগে পড়ে না, আবার ২৮ নভেম্বরের পরেও নয়। প্রতিবেশী দেশ কানাডায় অবশ্য থ্যাংকসগিভিং অনেক আগেই হয় — অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবারে; ২০২৬ সালে সেটি হয়েছে ১২ অক্টোবর, ১৯৫৭ সালের এক ঘোষণাপত্রের আওতায়।

শুরুর কথা: ১৬২১ সালের প্লিমাথের ভোজ

ইংল্যান্ড থেকে ধর্মীয় নিপীড়ন এড়িয়ে মেফ্লাওয়ার জাহাজে এসে পিলগ্রিমরা ১৬২০ সালে ম্যাসাচুসেটসের প্লিমাথে বসতি স্থাপন করে। কঠিন প্রথম শীতে তাদের অর্ধেকের মতো মারা যায়। বেঁচে থাকারা পরের বছর প্রথম ফসল ঘরে তুলতে পারলে তারা ১৬২১ সালের শরৎকালে তিন দিনের এক ভোজের আয়োজন করে। স্থানীয় ওয়ামপানোয়াগ জনগোষ্ঠীর নেতা মাসাসয়েট প্রায় নব্বইজন লোক নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে তৎকালীন বর্ণনায় জানা যায়, তাঁরা সঙ্গে পাঁচটি হরিণও এনেছিলেন। ঐতিহাসিকদের হিসাবে সেই ভোজ হয়েছিল সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর মাঝামাঝি সময়ে, আর তাতে ছিল বন্য পাখি, মাছ, ঝিনুক ও ভুট্টার তৈরি খাবার — আজকের চেনা আলু কিংবা পাই তখন ছিল না। মজার কথা, ঐতিহাসিকদের মতে সেটি কঠোর অর্থে 'থ্যাংকসগিভিং দিবস' ছিল না, বরং ফসলের আনন্দের ভোজ ছিল; পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেই তা কৃতজ্ঞতার প্রতীকী ছুটিতে রূপ নেয়।

১৬২১ সালের প্লিমাথের ফসল-ভোজের চিত্রকল্প

প্লিমাথের ১৬২১ সালের ফসল-ভোজ নিয়ে জেনি অগাস্টা ব্রাউনসকম্বের আঁকা চিত্রকল্প (ছবি: Jennie Augusta Brownscombe / Wikimedia Commons, public domain)

জাতীয় ছুটি হওয়ার লম্বা পথ

প্রতিটি রাজ্য ভিন্ন তারিখে ছুটি মানলেও দিনটিকে জাতীয় ছুটির মর্যাদা দিতে সময় লাগে। গোডেইজ লেডিস বুক পত্রিকার সম্পাদিকা সারা জোসেফা হেল কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রপতিদের কাছে লেখা পাঠিয়ে একটি জাতীয় থ্যাংকসগিভিং দিবসের দাবি জানান। তাঁর প্রচারণারই ফলশ্রুতিতে ১৮৬৩ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবারকে জাতীয় কৃতজ্ঞতা-দিবস ঘোষণা করেন। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। মহামন্দির সময় রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১৯৩৯ সালে ছুটিটি এক সপ্তাহ আগে এনে ক্রিসমাসের শপিং-মৌসুম লম্বা করতে চান — সেই সিদ্ধান্ত বিরোধীদের মুখে 'ফ্র্যাঙ্কসগিভিং' নাম পায়, আর দেশজুড়ে দুই দুই থ্যাংকসগিভিং মানার বিতর্ক বাঁধে দেয়। শেষপর্যন্ত ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেস আইন করে নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবারকেই চূড়ান্ত ছুটি নির্ধারণ করে দেয়।

টার্কি দিনের প্রথাগুলো

আজ থ্যাংকসগিভিং বলতে চোখে ভাসে পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া ভাজা টার্কির টেবিল। ২০১৯ সালের এক হিসাবে এই এক দিনেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ কোটি টার্কি পরিবেশিত হয়। ১৯২৪ সাল থেকে নিউ ইয়র্কের ম্যাসির থ্যাংকসগিভিং ডে প্যারেড দিনটির আরেক প্রতীক — বিশাল বেলুন-ভাস্কর্য শহরের রাস্তায় ভেসে চলে। আমেরিকান ফুটবলের ঐতিহ্যও পুরনো: এনএফএল প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় প্রতি বছর এই দিনে খেলা হয়, আর ১৯৪৫ সাল থেকে ডেট্রয়েট লায়ন্স ধারাবাহিকভাবে মাঠে নামে। রাষ্ট্রপতির 'টার্কি পার্ডনিং' — একটা টার্কিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে 'ক্ষমা' করে দেওয়ার হাস্যকর অনুষ্ঠানও — এখন দিনটির চেনা দৃশ্য; ১৯৮৯ সালে রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ থেকে এটি স্থায়ী প্রথা হয়েছে।

উইনসলো হোমারের থ্যাংকসগিভিং ভোজের নকশা

থ্যাংকসগিভিং দিনের ভোজ — ১৮৭১ সালে হার্পার্স উইকলিতে ছাপা উইনসলো হোমারের নকশা (ছবি: Winslow Homer / Wikimedia Commons, CC0)

'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' নামটি এল কোথা থেকে?

ব্ল্যাক ফ্রাইডে-র পেছনে কোনো রহস্যময় অভিশাপের গল্প নেই — নামটির জন্ম খুব বাস্তবের। নামের প্রথম ব্যবহার ১৯৫১ সালের নভেম্বরে 'ফ্যাক্টরি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স' জার্নালে পাওয়া যায়: থ্যাংকসগিভিংয়ের পরের দিন অসুস্থতার ছলে ছুটি নিয়ে চার দিনের সপ্তাহান্ত ভোগার শ্রমিকদের প্রসঙ্গে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে ফিলাডেলফিয়া ও রোচেস্টারের পুলিশ ক্রিসমাস-শপিং মৌসুমের শুরুতে শহরে জটলা আর যানজটের বর্ণনায় দিনটিকে 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' বলতেন। ১৯৬১ সালে নাম বদলে 'বিগ ফ্রাইডে' করার চেষ্টাও হয়, কিন্তু তা টেকেনি। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে নিউ ইয়র্ক টাইমসেও নামটি এই অর্থেই ব্যবহৃত হয়। আশির দশকের শুরুতে দোকান-মালিকদের পক্ষ থেকে আরও মানানসই এক ব্যাখ্যা জোড়া দেওয়া হয় — হিসাবের খাতায় লোকসান লেখা হয় লাল কালিতে, লাভ কালো কালিতে; ব্ল্যাক ফ্রাইডের বিক্রির ঢেউ দোকানগুলোকে 'কালোতে' ফিরিয়ে আনে। উল্লেখ্য, আরও আগে ১৮৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সোনার বাজারের ধসও 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' নামে পরিচিত, কিন্তু সেটি এই শপিং-দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

ব্ল্যাক ফ্রাইডের সকালে অ্যাপল স্টোরের সামনে ক্রেতার লম্বা লাইন

২০১১ সালের ব্ল্যাক ফ্রাইডের ভোরে নিউ ইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের অ্যাপল স্টোরের সামনে ক্রেতার লাইন (ছবি: JoeInQueens / Wikimedia Commons, CC BY 2.0)

কালো শুক্রবার থেকে সাইবার মানডে

আজ ব্ল্যাক ফ্রাইডে মানে একদিনের কোলাহল নয়, বরং নভেম্বরের এই ছুটি থেকে ক্রিসমাস পর্যন্ত কয়েক সপ্তাহ ধরে ছড়িয়ে থাকা ডিলের ধারা — যা আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকার হলিডে শপিং-সিজনের সূচনা। জাতীয় খুচরা বিক্রেতা ফেডারেশনের (এনআরএফ) হিসাবে ব্ল্যাক ফ্রাইডে উইকএন্ডে ২০১৯ সালে ক্রেতারা খরচ করেছিলেন প্রায় ৬৮.৮ বিলিয়ন ডলার, আর মহামারির ২০২০ সালে এই উইকএন্ডে দোকানে ও অনলাইনে মিলিয়ে আসেন ১৮ কোটি ৬০ লাখ ক্রেতা। অনলাইন বিক্রির গতি আরও দ্রুত: ২০২০ সালের ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন বিক্রি হয় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২২ সালে সেটি ছুঁয়েছিল রেকর্ড প্রায় ৯.১২ বিলিয়ন ডলার — তার প্রায় অর্ধেকের বেশিই তখন স্মার্টফোন থেকে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা এই মৌসুমে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করবেন — এমন অনুমানও ছিল। এই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে এনআরএফের শপ.অর্গ 'সাইবার মানডে' নামটি দেয় — ছুটির পরে অফিসে ফিরে মানুষের অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতার নামকরণ; ২০১৩ সালে দিনটির অনলাইন বিক্রি ছুঁয়েছিল ১.৭৩ বিলিয়ন ডলার।

বাংলার ক্রেতার জন্য ব্ল্যাক ফ্রাইডের অর্থ কী?

ব্ল্যাক ফ্রাইডে যুক্তরাষ্ট্রের ছুটি হলেও ডিলের ঢেউ সীমান্ত মানে না। অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই সপ্তাহে সফটওয়্যার, অ্যাপ-সাবস্ক্রিপশন, ই-বুক, অনলাইন কোর্স আর গ্যাজেটে বড় ছাড় দেয়, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের ক্রেতাই অনলাইনে নিতে পারেন — বিশেষত ডিজিটাল পণ্যগুলো ডেলিভারির ঝামেলা ছাড়াই পাওয়া যায়। এশিয়ার নিজস্ব প্রতিরূপও রয়েছে: চীনের 'সিঙ্গেলস ডে' বা ১১.১১ — যাকে বলা হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও সাইবার মানডে মিলিয়ের প্রায় চার গুণ বড় শপিং ইভেন্ট; ২০২৫ সালের হিসাবে সেখানে বিক্রি ছাড়িয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। তবে মনে রাখা ভালো: ডিলের প্রলোভনে অপরিচিত সাইটে কার্ডের তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা, চেকআউটে নিরাপদ সংযোগ (https) যাচাই করা আর আগের দামের সঙ্গে মিলিয়ে ছাড়ের আসল-বাসল মেপে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

এক নজরে: ২০২৬ সালের তারিখগুলো

  • থ্যাংকসগিভিং: বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৬
  • ব্ল্যাক ফ্রাইডে: শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৬
  • স্মল বিজনেস স্যাটারডে: শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৬
  • সাইবার মানডে: সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৬

চার শতাব্দী আগে প্লিমাথের তিন দিনের ভোজ থেকে আজকের বিলিয়ন-ডলারের অনলাইন মেলা — থ্যাংকসগিভিং আর ব্ল্যাক ফ্রাইডের এই যুগলবন্দি আসলে আমেরিকার ইতিহাস আর বাণিজ্যের চেনা ছকের এক প্রতিচ্ছবি। আর পড়শি বাংলার ভাগে এসেছে এই গল্পের সেই অংশ, যেখানে একটা মোবাইল স্ক্রিনের ওপারে কোটি-কোটি ডলারের ডিল হাতের নাগালে।

Add comment
কোন প্রকার অশ্লীল কমেন্ট করা যাবে না, করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত আরো তথ্য

বিশ্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যর তথ্য

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন