“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

রাখের উপবাসে প্রদীপের সারি আর ধোঁয়ার মাঝে ভক্তদের রাতজাগা আরাধনা
রাখের উপবাসের রাতজাগা আরাধনা (ছবি: কাজী সালাহউদ্দিন রাজু / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)
  • Sub Title: কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের শনি-মঙ্গলবারে দিনভর উপবাস আর সন্ধ্যার ঘৃতপ্রদীপ — বারদীকেন্দ্রিক বাংলার প্রদীপ-আরাধনা

কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের শনিবার আর মঙ্গলবারে বাংলার মন্দির-আশ্রম আর খোলা উঠোনগুলো জ্বলে ওঠে সারি সারি প্রদীপে। দিনভর নিরাহার, সন্ধ্যায় ঘৃতের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাতজাগা আরাধনা — এটাই রাখের উপবাস, যেখানে মানত একটাই: নিজের ও পরিবারের বিপদমুক্তি। নারায়ণগঞ্জের বারদীর লোকনাথ আশ্রম এই উৎসবের প্রধান কেন্দ্র; শেরপুর-গৌরীপুরসহ দেশজুড়ে আর পশ্চিমবঙ্গেও ছড়িয়ে আছে এর আখড়া। ব্রতের ইতিহাস, আচার-আয়োজন আর ২০২৬ সালের দিন-তালিকা নিয়ে এই প্রবন্ধ।

উপবাস রেখেই 'রাখের উপবাস'

নামটির পেছনেই লুকিয়ে আছে প্রথা — ভক্তরা উপবাস রাখেন বলেই এর নাম হয়েছে রাখের উপবাস। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের এই বার্ষিক ধর্মীয় আচার কার্তিক ব্রত নামেও পরিচিত। আচারের মূল কথা আত্মসংযম: ভক্তরা নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সুস্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও মঙ্গলকামনায় মানত করে উপবাস থাকেন। বিপদ থেকে রক্ষার প্রার্থনাই ব্রতের প্রাণ, তাই অনেকে একে ডাকেন 'বিপদমুক্তির উপবাস' নামে। আচারটি বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে অষ্টাদশ শতকের সাধক বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ভক্তিসাধনার সঙ্গে — তাঁর অনুসারীরা কার্তিকে প্রার্থনা, আত্মসংযম আর প্রদীপ উৎসর্গকে সাধনার অঙ্গ মানেন।

কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের শনি ও মঙ্গলবার

রাখের উপবাস মাসের যেকোনো দিনে নয় — পালিত হয় বাংলা কার্তিক মাসের শেষ পনেরো দিনের শনিবার ও মঙ্গলবারগুলোতে। পঞ্জিকায় কার্তিক এ বছর চলছে ১৭ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত; ফলে মাসের শেষ পনেরো দিনের মধ্যে এবার পড়েছে দুটি মঙ্গলবার (৩ ও ১০ নভেম্বর) আর দুটি শনিবার (৭ ও ১৪ নভেম্বর)। এই সময়টাই কালীপূজা আর দীপাবলির সপ্তাহ ঘিরে আলোয় ভরা — প্রদীপ জ্বালানোর লোকাচার উভয় উৎসবেই মিশে আছে। প্রতিটি উপবাস-দিনে মন্দির-আশ্রমগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তের সমাগম হয়, আর বছরে বছরে কোনো না কোনো শনি-মঙ্গলবারে সেই সমাগম শিখরে ওঠে।

দিনভর উপবাস, সন্ধ্যায় সারি সারি প্রদীপ

ভক্তরা সাধারণত সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সম্পূর্ণ উপবাস থাকেন। সূর্যাস্তের পর মন্দিরের প্রাঙ্গণ কিংবা খোলা উঠোনে সারিবদ্ধভাবে জ্বলে ওঠে শত শত ছোট মাটির প্রদীপ — ঘৃত কিংবা সরিষার তেলে। ধূপের ধোঁয়ায় পরিবেশ ধোঁয়শা হয়ে থাকে; ভক্তরা সারি বেঁধে প্রদীপের সামনে বসে প্রার্থনা, নামসংকীর্তন আর ধ্যানে মত্ত হন, অনেকে সারারাত জেগে থাকেন। প্রদীপের পাশে সাজানো হয় ফল-ফুল-মিষ্টির নৈবেদ্য। ময়মনসিংহের গৌরীপুর কিংবা শেরপুরের আশ্রমগুলোতে এই আয়োজনের প্রচলিত নামই 'ঘৃত প্রদীপ প্রজ্জ্বলন উৎসব'। ধোঁয়া আর প্রদীপের সারির দৃশ্য এতটাই মনোরম যে প্রতি বছর দেশি-বিদেশি আলোকচিত্রীদের লেন্সে উঠে আসে এই উৎসব।

রাখের উপবাসে সারি সারি প্রদীপ নিয়ে ভক্তদের আরাধনা

নৈবেদ্য-সাজানো প্রতিটি আসন, প্রদীপের সারি, উজ্জ্বল পোশাকে সারি বেঁধে বসা নারী-পুরুষ ভক্ত — সব মিলিয়ে উৎসবটি এক স্বতন্ত্র ঐতিহ্যচিত্রে পরিণত হয়েছে।

প্রদীপ ও নৈবেদ্য সাজিয়ে সারি বেঁধে বসা নারী-ভক্তরা

বারদী: বাবা লোকনাথের শেষ আখড়া

রাখের উপবাসের প্রধান কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার বারদী গ্রাম — ঐতিহাসিক সোনারগাঁও অঞ্চলের বুকে। এখানকার শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমেই উৎসবের সবচেয়ে বড় সমাগম হয়, কারণ সাধক লোকনাথ ব্রহ্মচারী জীবনের শেষ পর্ব কাটিয়েছিলেন এখানেই।

প্রচলিত বিবরণে লোকনাথের জন্ম ১৭৩০ সালের ৩১ আগস্ট (১৮ ভাদ্র ১১৩৭), জন্মাষ্টমীর দিনে, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বারাসত অঞ্চলের কচুয়া গ্রামে। এগারো বছর বয়সে কালীঘাটের যোগসাধক ভগবান গাঙ্গুলির কাছে দীক্ষা নেন; পাশে থাকেন বাল্যবন্ধু বেণীমাধব। দীর্ঘ চারণ-সন্ন্যাস আর হিমালয়ের কঠোর যোগসাধনার পর আফগানিস্তান, পারস্য, আরব, প্যালেস্টাইন, চীন ও তিব্বত ভ্রমণ করে ১৮৬৩ সালে সোনারগাঁওয়ে এসে বারদীতে আশ্রম গড়েন। তাঁর দর্শনের মূল কথা — সর্বভূতে ব্রহ্ম বিরাজমান, আত্মা অজর-অমর-অবিনাশী, একনিষ্ঠ ভক্তি ও যোগই মুক্তির পথ, আর জীবের হিতসাধনই শ্রেষ্ঠ মানবধর্ম। ১৮৯০ সালে (১৯ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৭) বারদীর আশ্রমেই তিনি দেহত্যাগ করেন; তাঁর দেহাবশেষ সেখানেই সংরক্ষিত। আজ বারদী দেশ-বিদেশের ভক্তদের কাছে বড় এক তীর্থক্ষেত্র।

ধোঁয়া আর প্রদীপের মাঝে রাতজাগা আরাধনা

সারা বাংলায় ছড়ানো প্রদীপ-ব্রত

বারদী হলো কেন্দ্র, কিন্তু রাখের উপবাস বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের নানা জেলায় এবং পশ্চিমবঙ্গে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর নামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আশ্রম, যেখানে কার্তিকে এই প্রদীপ-ব্রত পালিত হয়। ঢাকার স্বামীবাগের শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দিরে (১৯০৫; প্রতিষ্ঠাতা শক্তি ঔষধালয়ের মথুরামোহন মুখোপাধ্যায়) কার্তিক মাসে 'দামোদর প্রদীপ দান' উৎসব হয় — একই প্রদীপ-উৎসর্গের আরেক রূপ। প্রতি বছর এই দিনগুলোর প্রদীপের সারি আলোকচিত্রীদের লেন্স হয়ে দেশ-বিদেশে পৌঁছে যায় — এক সময়ের গ্রামীণ ব্রত আজ বাংলার সবচেয়ে চেনা ঐতিহ্যচিত্রগুলোর একটি।

এক নজরে রাখের উপবাস ২০২৬

  • সময়: বাংলা কার্তিকের শেষ পনেরো দিনের শনিবার ও মঙ্গলবার
  • এ বছরের দিন: ৩ ও ১০ নভেম্বর (মঙ্গলবার), ৭ ও ১৪ নভেম্বর (শনিবার)
  • প্রধান কেন্দ্র: বারদীর শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
  • আচার: দিনভর উপবাস; সন্ধ্যায় সারি সারি ঘৃতপ্রদীপ, ধূপ, নামসংকীর্তন, রাতজাগা
  • মানতের বিষয়: সুস্বাস্থ্য, পরিবারের সুরক্ষা, বিপদমুক্তি

তথ্যসূত্র

  • বাংলা উইকিপিডিয়া: 'রাখের উপবাস', 'লোকনাথ ব্রহ্মচারী' নিবন্ধ
  • বাংলাপিডিয়া: 'লোকনাথ ব্রহ্মচারী' (মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান)
  • সংবাদ-প্রতিবেদন: শেরপুর (সংবাদ সারাবেলা) ও গৌরীপুর (দৈনিক তৃতীয় মাত্রা)-য় 'রাখের উপবাস ও ঘৃত প্রদীপ প্রজ্জ্বলন'; প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর-এর বার্ষিক ফটো-কভারেজ
  • ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স (কাজী সালাহউদ্দিন রাজু, আজিম খান রনি) — CC BY-SA 4.0
Add comment
কোন প্রকার অশ্লীল কমেন্ট করা যাবে না, করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংস্কৃতি এর নতুন প্রবন্ধ

গড়াই নদীর তীর, কুষ্টিয়া
গড়াই নদীর তীর, রেনউইক পার্কসংলগ্ন এলাকা (ছবি: মোঃ সাকিবুল হাসান / Wikimedia Commons, CC BY 4.0)

গড়াই নদী কি ফিরে পেতে পারে তার হারানো ঐতিহ্য?

  • Sub Title: কুষ্টিয়ার জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী নদীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
একতারা-হাতে বাউল শিল্পী
বাউল শিল্পী (ছবি: Debavasya / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)

বাউল গান কি শুধু গান, নাকি মানুষের জীবনদর্শন?

  • Sub Title: লালন শাঁইজীর ভাবধারা, মানবতাবাদ, দেহতত্ত্ব ও আত্মঅনুসন্ধানের এক গভীর জগৎ
দুর্বিন শাহ
দুর্বিন শাহ

দুর্বিন শাহ

  • Sub Title: বাংলাদেশের প্রখ্যাত মরমী গীতিকবি ও বাউলসাধক
কার্তিক মাসে হেমন্তের ধানক্ষেত
হেমন্তের ধানক্ষেত (ছবি: Zaheed Sarwer Khan / Wikimedia Commons, CC BY 4.0)

কার্তিক মাস: শিশিরভেজা হেমন্তের আবাহন

  • Sub Title: শরতের বিদায় থেকে হেমন্তের শুভ্র সকাল — রস, ফসল আর পূর্ণিমার মাস; ছেঁউড়িয়ার তিরোধান থেকে কুষ্টিয়ার রস-ঐতিহ্য
সিলেট বিভাগের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ
সিলেট বিভাগের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ

সিলেট বিভাগের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ

  • Sub Title: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন