“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজীর ১৩৬তম তিরোধান দিবস ২০২৬
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজীর ১৩৬তম তিরোধান দিবস ২০২৬
  • Sub Title: মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও আত্মদর্শনের মহান সাধক ফকির লালন শাঁইজীর ১৩৬তম তিরোধান দিবস

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজী বাংলা ও বাঙালির আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও মানবতাবাদী চেতনার এক অনন্য সাধক। তাঁর জীবন, দর্শন ও গান আজও মানুষকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। তাঁর অমর সৃষ্টি শুধু বাংলার লোকসংগীতের সম্পদ নয়; বরং তা মানবজীবন, আত্মপরিচয়, প্রেম, সাম্য ও মুক্তির এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার নিজ আখড়ায় লালন শাঁইজি তিরোধান করেন। প্রতিবছর এই দিনটি তাঁর ভক্ত, অনুসারী ও সাধু-গুরুদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর পালিত হবে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজীর ১৩৬তম তিরোধান দিবস

১৩৬তম তিরোধান দিবস ২০২৬

তারিখ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
বাংলা তারিখ: ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
স্থান: লালন আখড়াবাড়ি, ছেঁউড়িয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

লালন শাঁইজীর তিরোধান দিবসকে ঘিরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি প্রতিবছর পরিণত হয় সাধু, বাউল, ভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থীদের মিলনকেন্দ্রে। লালন একাডেমি, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে সাধারণত আলোচনা, লালনসংগীত, সাধুসঙ্গসহ বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো লালন সাঁইজীর তিরোধান দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই বছর সরকার দিবসটিকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে লালনের দর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে জাতীয় পর্যায়ে নতুন গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি: সাধু-ভক্তদের মিলনভূমি

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া শুধু একটি স্থান নয়—লালন দর্শনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এটি একটি সাধনভূমি। এখানেই লালন শাঁইজি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় সাধনা, গান ও আত্মদর্শনের চর্চা করেছেন। তাঁর তিরোধানের পরও শিষ্য, ভক্ত ও অনুসারীরা এই আখড়াকে ঘিরে সমবেত হতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিরোধান দিবস উপলক্ষে এখানে গড়ে উঠেছে বৃহৎ স্মরণোৎসব ও মেলার ঐতিহ্য।

তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাউল ও সাধুরা ছেঁউড়িয়ায় এসে আখড়া গড়ে তোলেন। কেউ গান করেন, কেউ সাধুসঙ্গে অংশ নেন, কেউ লালনের দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। রাত গভীর হলেও অনেক আসরে একতারা, দোতারা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর থাকে আখড়াবাড়ির পরিবেশ।

লালনের গানের আসল শক্তি এখানেই—এ গান শুধু শোনার বিষয় নয়, বরং ভাবার এবং নিজের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে দেখার আহ্বান।

লালনের দর্শনে ‘মানুষ’

লালন শাঁইজীর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তিনি মানুষের পরিচয়কে কোনো বাহ্যিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেননি। জাত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তে তিনি মানুষের অন্তর্গত সত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে আত্মপরিচয়, মানবপ্রেম, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, সৃষ্টির রহস্য ও পরম সত্তার অনুসন্ধান। তাঁর দর্শনে মানুষকে বাদ দিয়ে ধর্ম বা সাধনার কোনো পূর্ণতা নেই।

এই মানবতাবাদী দর্শনই লালনকে তাঁর সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজকের পৃথিবীতেও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

জাত-পাত ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লালনের অবস্থান

লালন এমন এক সময়ে গান ও সাধনার মাধ্যমে নিজের দর্শন প্রকাশ করেছিলেন, যখন সমাজে জাত-পাত, ধর্মীয় বিভাজন ও নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্য ছিল প্রবল। তিনি প্রচলিত সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের অন্তর্গত পরিচয় অনুসন্ধান করেছেন।

তাঁর প্রশ্ন ছিল—মানুষের প্রকৃত পরিচয় কোথায়?

জন্ম, ধর্ম, জাত কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে নয়; বরং মানুষের ভেতরের সত্তায়।

এই কারণে লালনের দর্শন শুধু বাউল সম্প্রদায়ের নিজস্ব দর্শন নয়; এটি বৃহত্তর মানবসমাজের জন্য একটি অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

লালনের গান: দর্শনের সহজ ভাষা

লালনের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ছিল জটিল আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ভাবনাকে সহজ লোকভাষায় প্রকাশ করা। তাঁর গান শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে গভীর জীবনদর্শন।

মানুষ কে, মানুষ কোথা থেকে এসেছে, নিজের ভেতরের মানুষকে কীভাবে চেনা যায়, গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক কী, দেহ ও আত্মার সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্ন তাঁর অসংখ্য গানে বিভিন্ন রূপে উঠে এসেছে।

তাই লালনের গান একদিকে লোকসংগীত, অন্যদিকে দর্শনের সহজ পাঠ।

লালন ও কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়

কুষ্টিয়ার পরিচয়ের সঙ্গে লালন শাঁইজীর নাম আজ অবিচ্ছেদ্য। ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি শুধু কুষ্টিয়ার নয়, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকসংস্কৃতি ও সাধন-ঐতিহ্যের কেন্দ্র।

প্রতিবছর তিরোধান দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে আসেন। ভক্ত-অনুসারীদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শনার্থী, গবেষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরাও অংশ নেন এই স্মরণোৎসবে।

লালনের গান, সাধুসঙ্গ ও আখড়াকেন্দ্রিক সংস্কৃতি কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করেছে।

২০২৫ থেকে জাতীয় পর্যায়ে নতুন অধ্যায়

লালন শাঁইজীর তিরোধান দিবস দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বিশেষভাবে পালিত হয়ে আসছিল। তবে ২০২৫ সালে দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি উদযাপনের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে।

২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লালন শাহের তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এরপর ১৭ অক্টোবর ২০২৫ প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়।

এই স্বীকৃতি শুধু একটি দিবসের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধি নয়; এটি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, বাউল দর্শন এবং লালনের মানবতাবাদী চিন্তাকে জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছে।

১৩৬তম তিরোধান দিবসের তাৎপর্য

২০২৬ সালের ১৩৬তম তিরোধান দিবসে লালনকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর মৃত্যুদিন স্মরণ করা নয়। বরং তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর সামনে আবার দাঁড়ানো।

আজকের পৃথিবীতে ধর্মীয় বিভাজন, সামাজিক বৈষম্য, জাতিগত বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস যখন মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করছে, তখন লালনের মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে ভাবার সুযোগ দেয়।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—মানুষকে ভালোবাসা, মানুষকে বোঝা এবং নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়াই হতে পারে সত্যিকারের সাধনার পথ।

লালনকে জানতে হলে শুধু গান শুনলেই হবে না

লালনকে নিয়ে প্রতিবছর উৎসব হয়, মেলা বসে, গান গাওয়া হয়। কিন্তু লালনকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে তাঁর গান ও দর্শনকে গভীরভাবে পাঠ করা প্রয়োজন।

তাঁর গান শুধু মঞ্চের পরিবেশনা নয়; প্রতিটি গানের মধ্যে রয়েছে প্রশ্ন, দর্শন ও আত্মঅনুসন্ধানের আহ্বান।

তাই লালন উৎসবের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হবে তখনই, যখন উৎসবের গান ও আলোচনা মানুষের ব্যক্তিজীবনে মানবতা, সহনশীলতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে।

চিরন্তন লালন

১৮৯০ সালে ছেঁউড়িয়ার মাটিতে লালন শাঁইজীর শারীরিক জীবনের অবসান ঘটেছিল। কিন্তু তাঁর দর্শন ও গান থেমে যায়নি। একতারা হাতে বাউল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, লোকসংগীতশিল্পী থেকে আধুনিক শ্রোতা—প্রজন্মের পর প্রজন্ম লালনের সন্ধান করে চলেছে।

তাঁর তিরোধানের ১৩৬ বছর পরও সেই অনুসন্ধান শেষ হয়নি।

বরং সময় যত এগিয়েছে, লালনের প্রশ্নগুলো তত নতুন হয়ে ফিরে এসেছে।

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”— এই মানবতাবাদী আহ্বানের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে লালন দর্শনের এক গভীর সারকথা।

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে যখন ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে আবারও একতারা বাজবে, সাধুসঙ্গ বসবে, লালনের গান ধ্বনিত হবে—তখন শুধু একজন সাধককে স্মরণ করা হবে না; স্মরণ করা হবে এমন এক দর্শনকে, যেখানে মানুষের পরিচয় সবার আগে।

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজীর ১৩৬তম তিরোধান দিবসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লালনের গান বেঁচে থাকুক, লালনের মানবতার দর্শন বেঁচে থাকুক, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সম্প্রীতির চেতনা আরও বিস্তৃত হোক।

Comments

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন