চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির একটি ছোট্ট গ্রাম — মাইজভান্ডার। বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া একমাত্র সুফি তরিকার প্রাণকেন্দ্র এই গ্রাম। প্রতি বছর মাঘ মাসে এখানে যে ওরসে লাখো মানুষের ঢল নামে, তার বীজ বুনেছিলেন এক আলেম-সাধক — যিনি যশোর অঞ্চলের কাজীর চাকরি ছেড়েছিলেন, কলকাতার মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের আসনও ছেড়েছিলেন, সব ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন আধ্যাত্মিক জীবন। গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (১৮২৬–১৯০৬)-এর হাতে পত্তন হওয়া মাইজভান্ডার দরবার শরীফের পুরো ইতিহাস, উত্তরসূরিদের ধারা, হাজারো মাইজভান্ডারী গান আর কবিয়াল রমেশ শীলের সংগীতজগৎ — সব মিলিয়ে এই প্রবন্ধ।
মাইজভান্ডার কোথায়
মাইজভান্ডার গ্রাম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায়, চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার উত্তরে। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এটি ছিল প্রত্যন্ত এক গ্রাম; আজ সেই গ্রামের নামই একটি সুফি তরিকা, একটি সংগীত-ধারা আর বার্ষিক মহাসমাবেশের নাম হয়ে গেছে। দরবার শরীফের কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠাতার মাজার, মসজিদ, মঞ্জিল আর পুকুর — বছরের প্রায় সব দিনই দূর-দূরান্ত থেকে জিয়ারতকারীর আগমন চলে।

পুকুরের জলে প্রতিফলিত দরবার শরীফের মাজার-ভবন (ছবি: Azimronnie / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)
প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ: জন্ম, বংশ ও শিক্ষা
সৈয়দ আহমদ উল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৪ জানুয়ারি ১৮২৬ সালে (১ মাঘ ১২৩৩ বঙ্গাব্দ), মাইজভান্ডার গ্রামেই। পিতা সৈয়দ মতিউল্লাহ, মাতা সৈয়দা খায়রুন্নেছা। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন সৈয়দ বংশীয় — কথিত আছে, তাঁরা মদিনা থেকে বাগদাদ ও দিল্লি হয়ে মধ্যযুগীয় বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসেছিলেন। প্রপিতামহ সৈয়দ হামিদ উদ্দিন ছিলেন গৌড়ের নিযুক্ত ইমাম ও কাজী; শহরে মহামারী দেখা দিলে তিনি চট্টগ্রামের পটিয়ায় চলে আসেন। তাঁর পুত্র সৈয়দ আব্দুল কাদের হন ফটিকছড়ির আজিমনগরের ইমাম — সেখান থেকেই পরিবারটি এই অঞ্চলে থিতু হয়।
গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে আহমদ উল্লাহ উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় (১২৬০–১২৬৮ হিজরী)। আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী এই তরুণ হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক, দর্শন সহ যাবতীয় প্রচলিত বিষয়েই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন — তৎকালীন সমাজে তিনি খ্যাতিমান ওয়ায়েজ ও বক্তা হিসেবে পরিচিতি পান।
কাজীর চাকরি ছেড়ে সুফির পথে
শিক্ষাজীবন শেষে ১২৬৯ হিজরীতে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত ভারতের যশোর অঞ্চলের বিচার বিভাগীয় কাজী পদে। পাশাপাশি মুন্সেফী (আইন) অধ্যয়ন করে সেই পরীক্ষাতেও প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু পরের বছরই কাজীর পদ ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন শিক্ষকতায় — কলকাতার মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় হয়ে ওঠেন প্রধান শিক্ষক।
এরই মধ্যে ঘটে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়: সুফি সাধক সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ সালেহ কাদেরী লাহোরীর কাছে কাদেরিয়া তরিকায় বায়াত ও খেলাফতপ্রাপ্তি। তিনি সেই গুরুর ভ্রাতা দিলওয়ার আলী পাকবাজ লাহোরীর কাছেও অধ্যয়ন করেন। অল্পদিনেই তিনি পার্থিব দায়িত্ব ছেড়ে পুরোপুরি আধ্যাত্মিক জীবনে আত্মনিয়োগ করেন।
১৮৫৭: বাসগৃহ থেকে দরবার শরীফ
পীরের নির্দেশে ১৮৫৭ সালে সৈয়দ আহমদ উল্লাহ নিজ গ্রাম মাইজভান্ডারে ফিরে আসেন। ধীরে ধীরে সাধক ও দোয়া-প্রত্যাশীদের ভিড়ে তাঁর নিজের বাসগৃহ পরিণত হয় আধ্যাত্মিক দরবারে — লোকমুখে নাম হয়ে যায় মাইজভান্ডার দরবার শরীফ। প্রায় অর্ধশতাব্দী তিনি এই গ্রামে সাধনা ও মানুষের খেদমত করেন। ১৯০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ ১৩১৩ বঙ্গাব্দ; ২৭ জিলক্বদ ১৩২৩ হিজরী) ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; মাইজভান্ডারেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। অনুসারীরা আজও তাঁকে ডাকেন গাউছুল আজম, হযরত কেবলা, বড় মৌলানা, খাতেমুল অলদ, শাঁই-এ-লিল্লাহ — নানা সম্মানসূচক নামে।
উত্তরসূরিরা: বাবা ভান্ডারী থেকে আজ
প্রতিষ্ঠাতার পর দরবারের নেতৃত্বে আসেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সৈয়দ গোলামুর রহমান (১৮৬৫–১৯৩৭) — অনুসারীদের কাছে বাবা ভান্ডারী নামে অমর। চাচা তাঁকে আদর করে ডাকতেন "আমার বাগানের ফুল" বলে। জীবনের শেষ দিকে তিনি নিরন্তর সাধনায় এমনভাবে নিমগ্ন হয়েছিলেন যে মেলামেশা ছিল বিরল — এজন্য তিনি "মগদুব পীর" বলে খ্যাত। তাঁর ওফাত ২২ চৈত্র (সাধারণত ৫ এপ্রিল) — সেই দিনেই তাঁর ওরস হয়।
এরপর বিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় উত্তরসূরি সৈয়দ জিয়াউল হক (১৯২৮–১৯৮৮) — বাবা ভান্ডারীর দৌহিত্র। অনুসারীরা তাঁকে ডাকেন "বিশ্ব অলী", "শাহেনশাহ" বা আদর করে জিয়া বাবা। প্রচার-প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল ব্যাপক; তাঁর ওরস প্রতি বছর অক্টোবরে হয়।
গবেষক হান্স হার্ডারের বর্ণনায় মাইজভান্ডারের উত্তরাধিকার আজ দুই পরিবার-ধারায় বিভক্ত — প্রতিষ্ঠাতার নিজ বংশ (আহমদিয়া মঞ্জিল) আর বাবা ভান্ডারীর বংশ (রহমানিয়া মঞ্জিল); দুই ধারাই পাশাপাশি খেদমত ও আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভান্ডারী ও সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ দরবারের আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই পরিবারের সুনাম প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিও ছাড়িয়েছে — বাবা ভান্ডারীর নাতি সৈয়দ নজিবুল বাশর মাইজভাণ্ডারী বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য, এবং তিনি বাংলাদেশ দরগা-মাজার ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

দরবার শরীফে ভক্তের জিয়ারত (ছবি: Azimronnie / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)
'প্রাণবন্ত সুফিবাদ': মাইজভাণ্ডারী তরিকার বৈশিষ্ট্য
কাদেরিয়া তরিকার বাংলা-শাখা থেকে জন্ম নেওয়া মাইজভাণ্ডারী তরিকা বাংলা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একমাত্র সুফি তরিকা হিসেবে পরিচিত। অনুসারীরা এই ধারাকে ডাকেন প্রাণবন্ত সুফিবাদ নামে — যেখানে সাধনার বাহন সংগীত, আর সুফি-চর্চা গেঁথে থাকে সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনে। জিকির, মিলাদ আর মরমী গান — এই তিনটিই তরিকার প্রাণ। অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, মহান সুফি চিন্তক আইবনে আরবি (মৃত্যু ১২৪০) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে "চীনে" এক মহান সাধকের জন্ম হবে, যিনি স্থানীয় ভাষায় কথা বলবেন — মাইজভাণ্ডারীরা সেই "চীন"-কে ব্যাখ্যা করেন চট্টগ্রাম হিসেবে এবং সৈয়দ আহমদ উল্লাহকেই সেই প্রতীক্ষিত সাধক মানেন।
গবেষণা-প্রতিবেদন বলছে, মাইজভাণ্ডারী তরিকার অনুসারী আজ ১০ লাখের বেশি। তবে এই তরিকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সমাজের বহু-স্তরে বিস্তার — সাধারণ কৃষক থেকে শহুরে মধ্যবিত্ত, এমনকি অ-মুসলমানদের অংশগ্রহণও এখানে স্বাভাবিক; ওরসের মঞ্চে খ্যাতনামা অনেক পরিবেশকই হিন্দু।
মাইজভান্ডার ওরস: লাখো ভক্তের মিলনমেলা
প্রতিষ্ঠাতার ওফাতের স্মরণে প্রতি বছর মাঘ মাসের ৮–১০ তারিখে (সাধারণত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ) তিন দিনব্যাপী হয় মাইজভান্ডারের মূল ওরস। আনুমানিক ৫–৬ লাখ মানুষের সমাগমে গ্রামটি তখন মানবসমুদ্র — অনেকের দাবি, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জমায়েত। "আমিন আমিন" ধ্বনিত প্রাঙ্গণে চলে মিলাদ, জিকির, আলোচনা সভা আর মাইজভান্ডারী গানের আসর; প্রধান বিচারপতি থেকে বিদেশি রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত জিয়ারতে আসেন।
বছরে শুধু একটি নয় — বাবা ভান্ডারীর ওরস ২২ চৈত্রে (এপ্রিলের শুরুতে), জিয়া বাবার ওরস অক্টোবরে; ফলে বছরে কয়েকবারই মাইজভান্ডার পরিণত হয় লাখো মানুষের মিলনমেলায়।
মাইজভান্ডারী গান আর কবিয়াল রমেশ শীল
মাইজভাণ্ডারী তরিকার সাথেই জন্ম নিয়েছে বাংলার এক স্বতন্ত্র সংগীত-ধারা — মাইজভান্ডারী গান। গবেষকদের হিসাবে এ ধারায় ১০ হাজারের বেশি গান রচিত হয়েছে, রচয়িতা শতাধিক ভক্ত-কবি: সৈয়দ আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী, সৈয়দ আব্দুল গণি (মকবুলে কাঞ্চনপুরী), বজলুল করিম মন্দাকিনী, আব্দুস সালাম ভুজপুরী, আমিনুল হক ধর্মপুরী, আব্দুল গফুর হালী, মনমোহন দত্ত প্রমুখ। তত্ত্ব-সাহিত্যেও ধারাটি ধনী — আব্দুল গণি কাঞ্চনপুরীর উর্দু গ্রন্থ 'আইনা-ই-বারি' (১৯১৫) তরিকার ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ রচনা বলে গণ্য।
এই ধারার শীর্ষ নাম কবিয়াল রমেশ শীল (১৮৭৭–১৯৬৭) — বোয়ালখালির গোমদন্ডী গ্রামের এই কবিয়াল "রমেশ মাইজভান্ডারী" নামেই বহুল পরিচিত। কবিগানের লোকায়ত ঐতিহ্যে বেড়ে ওঠা রমেশ শীল রচনা করেছিলেন প্রায় ৩৫০টি মাইজভান্ডারী গান, নয়টি সংকলনে — আশেকমালা, শান্তিভান্ডার, মুক্তির দরবার, নূরে দুনিয়া, জীবনসাথী, সত্যদর্পণ, ভাণ্ডারে মাওলা, মানব বন্ধু ও ঈশ্কে সিরাজিয়া। আজও ওরসের প্রাঙ্গণে তাঁর গান গাওয়া হয়। আমাদের আঞ্চলিক সঙ্গীত বিভাগে রমেশ শীলের গানের পূর্ণ সংগ্রহ শোনা যায়।
মরমী বাংলার দুই প্রান্ত: লালন আর মাইজভান্ডার
বাংলার মরমী-মানসের দুটি বড় সমান্তরাল ধারা — একদিকে কুষ্টিয়া-কেন্দ্রিক লালন গীতি, অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কেন্দ্রিক মাইজভাণ্ডারী ভাবনা। দুটি ধারাই সংগীতকে সাধনার বাহন মানে, দুটিই লোকমানসে আজও প্রাণের মতো জীবন্ত। রমেশ শীলের জীবনই তার প্রমাণ — কবিগানের কবিয়াল-ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিক সংগীতের রূপকার; গানের সেই লোকজ জগৎটাই বাংলার সব মরমী ধারাকে সুতোয় বাঁধে।
একনজরে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠাতা | সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (গাউছুল আজম); জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৮২৬ |
| মৃত্যু | ২৩ জানুয়ারি ১৯০৬ (১০ মাঘ ১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |
| অবস্থান | মাইজভান্ডার গ্রাম, ফটিকছড়ি উপজেলা, চট্টগ্রাম (শহর থেকে প্রায় ৪২ কি.মি.) |
| পত্তন | ১৮৫৭ সালে নিজ বাসগৃহ আধ্যাত্মিক দরবারে পরিণত |
| তরিকা | মাইজভাণ্ডারী (কাদেরিয়া-শাখা); অনুসারীদের ভাষায় 'প্রাণবন্ত সুফিবাদ' |
| প্রধান ওরস | মাঘ ৮–১০ তারিখ (জানুয়ারির শেষ), তিন দিনব্যাপী |
| অন্যান্য ওরস | বাবা ভান্ডারী: ২২ চৈত্র (এপ্রিল); জিয়া বাবা: অক্টোবর |
| মাইজভান্ডারী গান | ১০,০০০-র বেশি; রমেশ শীলসহ শতাধিক রচয়িতা |
| অনুসারী | গবেষণা-প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০ লাখের বেশি |
তথ্যসূত্র
- বাংলা উইকিপিডিয়া — সৈয়দ আহমদ উল্লাহ, মাইজভান্ডার দরবার শরীফ, মাইজভান্ডারি গান, রমেশ শীল
- ইংরেজি উইকিপিডিয়া — Maizbhandari, Gulamur Rahman, Sayed Ziaul Haq, Syed Najibul Bashar Maizbhandari
- Hans Harder, Sufism and Saint Veneration in Contemporary Bangladesh: The Maijbhandaris of Chittagong (Routledge, 2011)
- প্রথম আলো — "ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার ওরসে ভক্তদের মিলনমেলা" (জানুয়ারি ২০১৭)
- সমকাল — "'বাবা ভান্ডারী'র ওরসে জনারণ্য মাইজভান্ডার" (এপ্রিল ২০২৬)
বাংলা
English
