“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

ওরসের রাতে আলোকসজ্জিত মাইজভান্ডার দরবার শরীফ ও ভক্তসমাগম
ওরসের রাতে আলোকসজ্জা ও ভক্তসমাগম, মাইজভান্ডার দরবার শরীফ (ছবি: Md Monsurul Azam / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)
  • Sub Title: বাংলার নিজস্ব সুফি তরিকার প্রাণকেন্দ্র — ১৮৫৭-র পত্তন থেকে আজকের লাখো-ভক্তের ওরস

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির একটি ছোট্ট গ্রাম — মাইজভান্ডার। বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া একমাত্র সুফি তরিকার প্রাণকেন্দ্র এই গ্রাম। প্রতি বছর মাঘ মাসে এখানে যে ওরসে লাখো মানুষের ঢল নামে, তার বীজ বুনেছিলেন এক আলেম-সাধক — যিনি যশোর অঞ্চলের কাজীর চাকরি ছেড়েছিলেন, কলকাতার মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের আসনও ছেড়েছিলেন, সব ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন আধ্যাত্মিক জীবন। গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (১৮২৬–১৯০৬)-এর হাতে পত্তন হওয়া মাইজভান্ডার দরবার শরীফের পুরো ইতিহাস, উত্তরসূরিদের ধারা, হাজারো মাইজভান্ডারী গান আর কবিয়াল রমেশ শীলের সংগীতজগৎ — সব মিলিয়ে এই প্রবন্ধ।

মাইজভান্ডার কোথায়

মাইজভান্ডার গ্রাম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায়, চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার উত্তরে। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এটি ছিল প্রত্যন্ত এক গ্রাম; আজ সেই গ্রামের নামই একটি সুফি তরিকা, একটি সংগীত-ধারা আর বার্ষিক মহাসমাবেশের নাম হয়ে গেছে। দরবার শরীফের কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠাতার মাজার, মসজিদ, মঞ্জিল আর পুকুর — বছরের প্রায় সব দিনই দূর-দূরান্ত থেকে জিয়ারতকারীর আগমন চলে।

পুকুরের জলে প্রতিফলিত মাইজভান্ডার দরবার শরীফের মাজার-ভবন

পুকুরের জলে প্রতিফলিত দরবার শরীফের মাজার-ভবন (ছবি: Azimronnie / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)

প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ: জন্ম, বংশ ও শিক্ষা

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৪ জানুয়ারি ১৮২৬ সালে (১ মাঘ ১২৩৩ বঙ্গাব্দ), মাইজভান্ডার গ্রামেই। পিতা সৈয়দ মতিউল্লাহ, মাতা সৈয়দা খায়রুন্নেছা। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন সৈয়দ বংশীয় — কথিত আছে, তাঁরা মদিনা থেকে বাগদাদ ও দিল্লি হয়ে মধ্যযুগীয় বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসেছিলেন। প্রপিতামহ সৈয়দ হামিদ উদ্দিন ছিলেন গৌড়ের নিযুক্ত ইমাম ও কাজী; শহরে মহামারী দেখা দিলে তিনি চট্টগ্রামের পটিয়ায় চলে আসেন। তাঁর পুত্র সৈয়দ আব্দুল কাদের হন ফটিকছড়ির আজিমনগরের ইমাম — সেখান থেকেই পরিবারটি এই অঞ্চলে থিতু হয়।

গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে আহমদ উল্লাহ উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় (১২৬০–১২৬৮ হিজরী)। আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী এই তরুণ হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক, দর্শন সহ যাবতীয় প্রচলিত বিষয়েই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন — তৎকালীন সমাজে তিনি খ্যাতিমান ওয়ায়েজ ও বক্তা হিসেবে পরিচিতি পান।

কাজীর চাকরি ছেড়ে সুফির পথে

শিক্ষাজীবন শেষে ১২৬৯ হিজরীতে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ-শাসিত অবিভক্ত ভারতের যশোর অঞ্চলের বিচার বিভাগীয় কাজী পদে। পাশাপাশি মুন্সেফী (আইন) অধ্যয়ন করে সেই পরীক্ষাতেও প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু পরের বছরই কাজীর পদ ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন শিক্ষকতায় — কলকাতার মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় হয়ে ওঠেন প্রধান শিক্ষক।

এরই মধ্যে ঘটে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়: সুফি সাধক সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ সালেহ কাদেরী লাহোরীর কাছে কাদেরিয়া তরিকায় বায়াত ও খেলাফতপ্রাপ্তি। তিনি সেই গুরুর ভ্রাতা দিলওয়ার আলী পাকবাজ লাহোরীর কাছেও অধ্যয়ন করেন। অল্পদিনেই তিনি পার্থিব দায়িত্ব ছেড়ে পুরোপুরি আধ্যাত্মিক জীবনে আত্মনিয়োগ করেন।

১৮৫৭: বাসগৃহ থেকে দরবার শরীফ

পীরের নির্দেশে ১৮৫৭ সালে সৈয়দ আহমদ উল্লাহ নিজ গ্রাম মাইজভান্ডারে ফিরে আসেন। ধীরে ধীরে সাধক ও দোয়া-প্রত্যাশীদের ভিড়ে তাঁর নিজের বাসগৃহ পরিণত হয় আধ্যাত্মিক দরবারে — লোকমুখে নাম হয়ে যায় মাইজভান্ডার দরবার শরীফ। প্রায় অর্ধশতাব্দী তিনি এই গ্রামে সাধনা ও মানুষের খেদমত করেন। ১৯০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ ১৩১৩ বঙ্গাব্দ; ২৭ জিলক্বদ ১৩২৩ হিজরী) ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন; মাইজভান্ডারেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। অনুসারীরা আজও তাঁকে ডাকেন গাউছুল আজম, হযরত কেবলা, বড় মৌলানা, খাতেমুল অলদ, শাঁই-এ-লিল্লাহ — নানা সম্মানসূচক নামে।

উত্তরসূরিরা: বাবা ভান্ডারী থেকে আজ

প্রতিষ্ঠাতার পর দরবারের নেতৃত্বে আসেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সৈয়দ গোলামুর রহমান (১৮৬৫–১৯৩৭) — অনুসারীদের কাছে বাবা ভান্ডারী নামে অমর। চাচা তাঁকে আদর করে ডাকতেন "আমার বাগানের ফুল" বলে। জীবনের শেষ দিকে তিনি নিরন্তর সাধনায় এমনভাবে নিমগ্ন হয়েছিলেন যে মেলামেশা ছিল বিরল — এজন্য তিনি "মগদুব পীর" বলে খ্যাত। তাঁর ওফাত ২২ চৈত্র (সাধারণত ৫ এপ্রিল) — সেই দিনেই তাঁর ওরস হয়।

এরপর বিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় উত্তরসূরি সৈয়দ জিয়াউল হক (১৯২৮–১৯৮৮) — বাবা ভান্ডারীর দৌহিত্র। অনুসারীরা তাঁকে ডাকেন "বিশ্ব অলী", "শাহেনশাহ" বা আদর করে জিয়া বাবা। প্রচার-প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল ব্যাপক; তাঁর ওরস প্রতি বছর অক্টোবরে হয়।

গবেষক হান্স হার্ডারের বর্ণনায় মাইজভান্ডারের উত্তরাধিকার আজ দুই পরিবার-ধারায় বিভক্ত — প্রতিষ্ঠাতার নিজ বংশ (আহমদিয়া মঞ্জিল) আর বাবা ভান্ডারীর বংশ (রহমানিয়া মঞ্জিল); দুই ধারাই পাশাপাশি খেদমত ও আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভান্ডারী ও সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ দরবারের আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই পরিবারের সুনাম প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিও ছাড়িয়েছে — বাবা ভান্ডারীর নাতি সৈয়দ নজিবুল বাশর মাইজভাণ্ডারী বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য, এবং তিনি বাংলাদেশ দরগা-মাজার ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

মাইজভান্ডার দরবার শরীফে ভক্তের জিয়ারত

দরবার শরীফে ভক্তের জিয়ারত (ছবি: Azimronnie / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0)

'প্রাণবন্ত সুফিবাদ': মাইজভাণ্ডারী তরিকার বৈশিষ্ট্য

কাদেরিয়া তরিকার বাংলা-শাখা থেকে জন্ম নেওয়া মাইজভাণ্ডারী তরিকা বাংলা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একমাত্র সুফি তরিকা হিসেবে পরিচিত। অনুসারীরা এই ধারাকে ডাকেন প্রাণবন্ত সুফিবাদ নামে — যেখানে সাধনার বাহন সংগীত, আর সুফি-চর্চা গেঁথে থাকে সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনে। জিকির, মিলাদ আর মরমী গান — এই তিনটিই তরিকার প্রাণ। অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, মহান সুফি চিন্তক আইবনে আরবি (মৃত্যু ১২৪০) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে "চীনে" এক মহান সাধকের জন্ম হবে, যিনি স্থানীয় ভাষায় কথা বলবেন — মাইজভাণ্ডারীরা সেই "চীন"-কে ব্যাখ্যা করেন চট্টগ্রাম হিসেবে এবং সৈয়দ আহমদ উল্লাহকেই সেই প্রতীক্ষিত সাধক মানেন।

গবেষণা-প্রতিবেদন বলছে, মাইজভাণ্ডারী তরিকার অনুসারী আজ ১০ লাখের বেশি। তবে এই তরিকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সমাজের বহু-স্তরে বিস্তার — সাধারণ কৃষক থেকে শহুরে মধ্যবিত্ত, এমনকি অ-মুসলমানদের অংশগ্রহণও এখানে স্বাভাবিক; ওরসের মঞ্চে খ্যাতনামা অনেক পরিবেশকই হিন্দু।

মাইজভান্ডার ওরস: লাখো ভক্তের মিলনমেলা

প্রতিষ্ঠাতার ওফাতের স্মরণে প্রতি বছর মাঘ মাসের ৮–১০ তারিখে (সাধারণত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ) তিন দিনব্যাপী হয় মাইজভান্ডারের মূল ওরস। আনুমানিক ৫–৬ লাখ মানুষের সমাগমে গ্রামটি তখন মানবসমুদ্র — অনেকের দাবি, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জমায়েত। "আমিন আমিন" ধ্বনিত প্রাঙ্গণে চলে মিলাদ, জিকির, আলোচনা সভা আর মাইজভান্ডারী গানের আসর; প্রধান বিচারপতি থেকে বিদেশি রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত জিয়ারতে আসেন।

বছরে শুধু একটি নয় — বাবা ভান্ডারীর ওরস ২২ চৈত্রে (এপ্রিলের শুরুতে), জিয়া বাবার ওরস অক্টোবরে; ফলে বছরে কয়েকবারই মাইজভান্ডার পরিণত হয় লাখো মানুষের মিলনমেলায়।

মাইজভান্ডারী গান আর কবিয়াল রমেশ শীল

মাইজভাণ্ডারী তরিকার সাথেই জন্ম নিয়েছে বাংলার এক স্বতন্ত্র সংগীত-ধারা — মাইজভান্ডারী গান। গবেষকদের হিসাবে এ ধারায় ১০ হাজারের বেশি গান রচিত হয়েছে, রচয়িতা শতাধিক ভক্ত-কবি: সৈয়দ আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী, সৈয়দ আব্দুল গণি (মকবুলে কাঞ্চনপুরী), বজলুল করিম মন্দাকিনী, আব্দুস সালাম ভুজপুরী, আমিনুল হক ধর্মপুরী, আব্দুল গফুর হালী, মনমোহন দত্ত প্রমুখ। তত্ত্ব-সাহিত্যেও ধারাটি ধনী — আব্দুল গণি কাঞ্চনপুরীর উর্দু গ্রন্থ 'আইনা-ই-বারি' (১৯১৫) তরিকার ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ রচনা বলে গণ্য।

এই ধারার শীর্ষ নাম কবিয়াল রমেশ শীল (১৮৭৭–১৯৬৭) — বোয়ালখালির গোমদন্ডী গ্রামের এই কবিয়াল "রমেশ মাইজভান্ডারী" নামেই বহুল পরিচিত। কবিগানের লোকায়ত ঐতিহ্যে বেড়ে ওঠা রমেশ শীল রচনা করেছিলেন প্রায় ৩৫০টি মাইজভান্ডারী গান, নয়টি সংকলনে — আশেকমালা, শান্তিভান্ডার, মুক্তির দরবার, নূরে দুনিয়া, জীবনসাথী, সত্যদর্পণ, ভাণ্ডারে মাওলা, মানব বন্ধু ও ঈশ্কে সিরাজিয়া। আজও ওরসের প্রাঙ্গণে তাঁর গান গাওয়া হয়। আমাদের আঞ্চলিক সঙ্গীত বিভাগে রমেশ শীলের গানের পূর্ণ সংগ্রহ শোনা যায়।

মরমী বাংলার দুই প্রান্ত: লালন আর মাইজভান্ডার

বাংলার মরমী-মানসের দুটি বড় সমান্তরাল ধারা — একদিকে কুষ্টিয়া-কেন্দ্রিক লালন গীতি, অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কেন্দ্রিক মাইজভাণ্ডারী ভাবনা। দুটি ধারাই সংগীতকে সাধনার বাহন মানে, দুটিই লোকমানসে আজও প্রাণের মতো জীবন্ত। রমেশ শীলের জীবনই তার প্রমাণ — কবিগানের কবিয়াল-ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মাইজভান্ডারী আধ্যাত্মিক সংগীতের রূপকার; গানের সেই লোকজ জগৎটাই বাংলার সব মরমী ধারাকে সুতোয় বাঁধে।

একনজরে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ

বিষয়তথ্য
প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (গাউছুল আজম); জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৮২৬
মৃত্যু ২৩ জানুয়ারি ১৯০৬ (১০ মাঘ ১৩১৩ বঙ্গাব্দ)
অবস্থান মাইজভান্ডার গ্রাম, ফটিকছড়ি উপজেলা, চট্টগ্রাম (শহর থেকে প্রায় ৪২ কি.মি.)
পত্তন ১৮৫৭ সালে নিজ বাসগৃহ আধ্যাত্মিক দরবারে পরিণত
তরিকা মাইজভাণ্ডারী (কাদেরিয়া-শাখা); অনুসারীদের ভাষায় 'প্রাণবন্ত সুফিবাদ'
প্রধান ওরস মাঘ ৮–১০ তারিখ (জানুয়ারির শেষ), তিন দিনব্যাপী
অন্যান্য ওরস বাবা ভান্ডারী: ২২ চৈত্র (এপ্রিল); জিয়া বাবা: অক্টোবর
মাইজভান্ডারী গান ১০,০০০-র বেশি; রমেশ শীলসহ শতাধিক রচয়িতা
অনুসারী গবেষণা-প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০ লাখের বেশি

তথ্যসূত্র

Add comment
কোন প্রকার অশ্লীল কমেন্ট করা যাবে না, করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন