মানব ইতিহাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সবচেয়ে বিপ্লবী আবিষ্কার হলো ইন্টারনেট। আধুনিক পৃথিবীর অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, যোগাযোগ ও জীবনযাত্রার কেন্দ্রে আজ ইন্টারনেট। তবে এই প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল অতি সাধারণভাবে—একটি সামরিক গবেষণা প্রকল্প হিসাবে। সময়ের সাথে সাথে এটি পরিণত হয়েছে মানব সভ্যতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের ভিত্তি অবকাঠামোতে।
ইন্টারনেটের সূচনা: ARPANET যুগ (১৯৬০–১৯৭০ দশক)
১৯৬০-এর দশকে শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর DARPA (পরে ARPA) এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা শুরু করে যা পারমাণবিক আক্রমণেও টিকে থাকতে পারে। এর ফলাফল ছিল ARPANET, যা ১৯৬৯ সালে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় কম্পিউটারকে যুক্ত করেছিল — UCLA, Stanford, UC Santa Barbara এবং University of Utah।
- প্রথম বার্তা পাঠানো হয়েছিল UCLA থেকে Stanford-এ
- কমান্ড ছিল "LOGIN"
- কিন্তু সার্ভার ক্র্যাশ করে গিয়ে স্ক্রিনে দেখা যায় মাত্র "LO"—এটাই ইন্টারনেটের প্রথম মেসেজ!
TCP/IP এবং আধুনিক নেটওয়ার্ক (১৯৭০–১৯৮০ দশক)
ইন্টারনেটের ভিত্তিগত প্রযুক্তি আসে দু’জন প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর হাত ধরে — ভিন্ট সার্ফ এবং রবার্ট কান। তারা তৈরি করেন TCP/IP প্রোটোকল, যা ১৯৮৩ সালে ARPANET-এ বাধ্যতামূলক হয় এবং এটি আধুনিক ইন্টারনেটের মূল ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই সময়েই আসে:
- Email (Ray Tomlinson, 1971)
- DNS (Domain Name System, 1984)
ইমেইল মানুষের যোগাযোগ পদ্ধতিকে বদলে দেয় এবং DNS ওয়েব ঠিকানাকে সহজ করে তোলে (.com, .org, .gov ইত্যাদি)।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের উদ্ভাবন (১৯৯০ দশক)
ইন্টারনেটকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (WWW)—যা ১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি উদ্ভাবন করেন CERN-এ কাজ করার সময়।
তার উদ্ভাবন:
- HTML
- HTTP
- First Web Browser
- First Web Server
১৯৯১ সালে WWW সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। এরপর শুরু হয় ওয়েবসাইট তৈরির যুগ, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, ওয়েব ব্রাউজার (Netscape, পরে Internet Explorer) এবং ই-কমার্সের বিকাশ।
ডট-কম বুম এবং সোশ্যাল ওয়েব (২০০০–২০১০)
২০০০ সালের শুরুর দিকে ‘ডট-কম বুম’ ঘটে — অসংখ্য ইন্টারনেট কোম্পানি জন্ম নেয়, অনেকগুলো ধ্বংসও হয়। এর মাঝেই গুগল, অ্যামাজন, ইবি মত প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী শীর্ষ অবস্থানে ওঠে।
এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- Yahoo - 1994
- Google Search - 1998
- Skype - 2003
- Wikipedia - 2001
- Facebook - 2004
- YouTube - 2005
- Twitter - 2006
- Smartphone Revolution (iPhone - 2007, Android - 2008)
ইন্টারনেট হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ, ভিডিও শেয়ারিং এবং মোবাইল ভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
ক্লাউড, AI এবং IoT যুগ (২০১০–বর্তমান)
২০১০-এর দশক থেকে ইন্টারনেট নতুন মাত্রা পায়:
- Cloud Computing (AWS, Azure, Google Cloud)
- Streaming Platforms (Netflix, Spotify)
- Mobile Apps & Fintech
- Internet of Things (IoT)
- Blockchain & Cryptocurrency
- Artificial Intelligence and Machine Learning
- 5G Internet Technology
আজ ইন্টারনেট কেবল মানুষের মধ্যে নয়, মেশিন থেকেও যোগাযোগ স্থাপন করে—যাকে বলে Machine-to-Machine Communication।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইন্টারনেট
বর্তমানে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, ব্যাংকিং, বিনোদন—সবই ইন্টারনেট নির্ভর।
ভবিষ্যতে ইন্টারনেট আরও স্মার্ট হবে—
- 6G নেটওয়ার্ক
- Quantum Internet
- Metaverse
- AI-Driven Web
- Decentralized Web (Web 3.0)
এগুলো আমাদের ডিজিটাল জীবনকে আরও উন্নত, দ্রুত এবং নিরাপদ করবে।
ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়েছিল সামরিক পরীক্ষাগার থেকে, যা আজ মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির এই ধারাবাহিক উন্নতি মানুষের জ্ঞান, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করেছে। ভবিষ্যতের ইন্টারনেট হবে আরও স্বয়ংক্রিয়, বুদ্ধিমান এবং সর্বব্যাপী—যা মানব জীবনের প্রতিটি মিনিটকে আরও গতিশীল ও সংযুক্ত করে তুলবে।

Comments