প্রায় নয় বছরের প্রতীক্ষার পর ইলন মাস্ক আবারও পৃথিবীকে চমকে দিলেন। গত ১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাতে (স্থানীয় সময় রাত ৯টা) টেসলা প্রকাশ্যে দেখাল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় প্রজন্মের Tesla Roadster — আর সেই ডেমোতেই গাড়িটি সত্যি সত্যি মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে গেল। সংকুচিত বাতাসের থ্রাস্টারে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও গাড়িটি হোভার করেছে, ব্যারেল রোল দিয়ে ঘুরেছে, এমনকি উল্টো হয়ে চলেছে — এমন দৃশ্য গাড়ির ইতিহাসে আগে কেউ প্রকাশ্যে দেখায়নি বললেই চলে।
শুধু সেটুকুই নয়। ডেমোতে গাড়িটি ০ থেকে ৬০ মাইল গতিতে পৌঁছেছে মাত্র ০.৮১ সেকেন্ডে — এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে! ডেমো শেষে মাস্ক কেবল বলেছিলেন, "Well, it worked" — অর্থাৎ 'ভালোই কাজ করল।' কিন্তু এই সাদামাটা বাক্যের পেছনে জড়িয়ে আছে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রায় এক দশকের গবেষণা, অগুনতি বিলম্ব, হাজারো ক্রেতার ২৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জমার টাকা আর বহু প্রতিশ্রুতির ইতিহাস। এই প্রতিবেদনে থাকছে সেই পুরো গল্প — প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, দাম কত, কখন হাতে পৌঁছাবে এবং কেন সমালোচকরা এখনও সন্দেহে অনমনীয়।
আকাশে ওড়া গাড়ি — সেই রাতে যা দেখা গেল
টেসলার নিজস্ব সম্প্রচারে বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক দর্শক সরাসরি দেখেছেন এই ডেমো। ইভেন্টের শুরুতেই গাড়িটি এমনভাবে মাটি থেকে উঠে কিছুক্ষণ ভেসে থাকে, যা দেখে দর্শক-সাংবাদিকদের বেশিরভাগই প্রথমে ভেবেছিলেন এটা হয়তো কোনো ক্যামেরা-ট্রিক বা বিশেষ ব্যবস্থার ফল। কিন্তু বারবার বিভিন্ন কোণ থেকে দেখানো ভিডিও ও লাইভ প্রেজেন্টেশন সেই সন্দেহ দূর করে দিল — গাড়ির নিজের থ্রাস্টারই এই 'উড়া' সম্ভব করছিল।
তারপর একের পর এক এল আরও অবিশ্বাস্য পরীক্ষা। মার্কিন অটো-মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, গাড়িটি একেবারে ভূমির ওপর দিয়ে চলতে চলতে শূন্যে ওঠে, তারপর ঘুরে যায় ব্যারেল রোল দিয়ে, কোথাও 'কিক ফ্লিপ' মেরে ওঠে, আবার কোথাও রাস্তার ওপর সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে (আপসাইড ডাউন) চলেও দেখায়। সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হলো — গাড়িটি একটি উল্লম্ব পৃষ্ঠে 'সাক' হয়ে লেগে থাকে, যেন চুম্বক দিয়ে টেনে রাখা! রোড অ্যান্ড ট্র্যাক পত্রিকা এই তিনটি স্টান্টকে বলেছে "৩টি সবচেয়ে পাগলাটে কসরত"।
গতির হিসাবটা আরও চমকপ্রদ। অটোউইক ও এডমান্ডসের পরীক্ষা-রিপোর্ট অনুযায়ী গাড়িটি ০ থেকে ৬০ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিতে পৌঁছেছে মাত্র ০.৮১ সেকেন্ডে। তুলনা দিলে — পৃথিবীর দ্রুততম উৎপাদিত স্পোর্টস কারগুলোও এই সময়ের দ্বিগুণ বা তার বেশি সময় নেয়। ফর্মুলা ওয়ান রেসিং কারও এই পারফরম্যান্সের মুখে পিছিয়ে পড়ে, দাবি করছেন টেসলার পক্ষের প্রযুক্তিবিদরা।
ডেমো শেষে স্টেজে ফের ইলন মাস্ক। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "Well, it worked" — অর্থাৎ এত দিনের প্রচেষ্টা 'ভালোই কাজ করেছে'। উল্লেখ্য, ইভেন্টের আগেই মাস্ক সোশ্যাল মিডিয়ায় টিজ করেছিলেন, এটি হতে পারে "সর্বকালের সেরা পণ্য-প্রদর্শনী (greatest product demo of all time)"। ইভেন্ট শেষে মিডিয়া যে সাড়া ফেলল, তাতে সেই দাবি বেশ খানিকটা ভাস্বরই — লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স, সিএনএন, বিবিসি-ঘরানার সবাই নিউজ করেছে 'উড়ন্ত টেসলা'।
তবে এটাও সত্যি, যে কেউ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে বসে নেই — অনেকেই তো সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন: এসব কসরত কি সত্যিই 'উড়া' নাকি শুধুই প্রচারের কসরত? সেই বিতর্কের কথা আমরা একটু পরে বলব।
নিচের ভিডিওতে টেসলার অফিসিয়াল সম্প্রচার থেকে দেখুন সেই বিস্ময়কর মুহূর্তগুলো:
এই গাড়ি উড়ে কীভাবে চলে? প্রযুক্তির ভেতরে
নতুন রোডস্টারের মূল কম্পিউটার-গেম-স্টাইল প্রযুক্তিটি হলো সংকুচিত বাতাসের থ্রাস্টার (compressed-air thrusters)। এই প্রযুক্তি মহাকাশে দীর্ঘদিন চালু — 'কোল্ড গ্যাস থ্রাস্টার' নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় উচ্চচাপে সংরক্ষিত গ্যাস মুহূর্তের জন্য ছেড়ে দিয়ে যান্ত্রিক বল (থ্রাস্ট) তৈরি করা হয়। স্পেসএক্সের সহায়তায় সেই মহাকাশ-প্রযুক্তিই এবার মিনিয়েচার আকারে বসানো হয়েছে গাড়ির চারপাশে।
সংখ্যায় বললে: প্রযুক্তি বিশ্লেষণী সূত্র টেক-ইনসাইডার জানাচ্ছে, গাড়িটিতে রয়েছে প্রায় ২৫০ কেজি সংকুচিত বাতাস, যা রাখা হয় ৪৪০ বার বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ট্যাংকে। রেস্তরাঁয় ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের চাপ সাধারণত ১৫০–২০০ বার — তার তুলনায় ৪৪০ বার অভাবনীয় উচ্চচাপ। এই বাতাস নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দিলে গাড়ি মুহূর্তের জন্য হালকা হয়ে ওঠে, লাফ দেয়, ঘোরে, বা এক পাশে চাপ দিয়ে আটকে থাকে।
কিন্তু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। এই 'উড়া' টেকসই নয় — ট্যাংকের বাতাস কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়, তাই এটি বিমানের মতো অবিরাম উড্ডয়ন নয়, বরং সংক্ষিপ্ত বিস্ফোরণ-জাতীয় কসরত। রয়টার্স সরাসরি লিখেছে "লিমিটেড ফ্লাইট" — অর্থাৎ সীমিত উড়াই হলো এই গাড়ির প্রকৃত সক্ষমতা।
গাড়ির সবচেয়ে আলোচিত 'দেয়ালে সাক' কসরতের জন্য দায়ী আরেকটি উপাদান — শক্তিশালী ফ্যান-ব্যবস্থা। গাড়ির নিচের দিকে কাজ করে এমন ফ্যান যেটি বাতাস টেনে নিচে ফেলে, ফলে গাড়িটি নিজেকে পৃষ্ঠের ওপর 'গ্লু' করে আটকে রাখে। ইঞ্জাডগেট ও রেসার ম্যাগাজিন মনে করিয়ে দিয়েছে — এই ধারণা নতুন নয়, প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরনো (বিস্তারিত সামনে আসছে)।
টেসলা অরাকলের মতো সূত্র জানাচ্ছে, নতুন রোডস্টার আসছে তিনটি ভ্যারিয়েন্টে — Performance, Thrust এবং Rocket। সবচেয়ে ব্যয়বহুল 'রকেট' ভ্যারিয়েন্টেই থাকবে স্পেসএক্স-প্যাকেজের পূর্ণ থ্রাস্টার-সেট। তেসলারাতির রিপোর্ট অনুযায়ী, মালিকদের জন্য থাকছে বিশেষ 'Flying Stunt Mode' — একটি নির্দিষ্ট ঘেরা ট্র্যাকে গাড়ির এই স্টান্ট-ক্ষমতা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। অর্থাৎ রাস্তাঘাটে যেকোনো জায়গায় লাফ দিয়ে ঘুরে যাওয়ার সুযোগ নয়; নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কথা মাথায় রেখেই সেটি সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে।
নয় বছরের প্রতীক্ষার পুরো গল্প
রোডস্টার নামটি টেসলার ইতিহাসে পবিত্রতম নামগুলোর একটি। ২০০৮ সালে বিদ্যুৎগতিতে দেউলিয়া প্রায় টেসলা কোম্পানি বাঁচিয়ে তুলেছিল প্রথম প্রজন্মের রোডস্টার — লোটাস এলিস চ্যাসিসের ওপর নির্মিত সেই বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কারটিই ছিল টেসলার প্রথম উৎপাদিত গাড়ি।
২০১৭ সালের নভেম্বরে মাস্ক ঘোষণা দিলেন দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার আসছে — এমন গাড়ি, যা ০-৬০ মাইলে যাবে ১.৯ সেকেন্ডে, এক চার্জে চলবে ৬২০ মাইল, আর সর্বোচ্চ গতি ছুঁবে ২৫০ মাইল প্রতি ঘণ্টা ছাড়িয়ে। তখন বলা হয়েছিল, ২০২০ সালে ডেলিভারি হবে। পরিচিত গল্পই — গাড়ি আসেনি। ২০২০ গেল, ২০২১ গেল, ২০২২ গেল — মাস্ক বারবার বললেন, আগে সাইবারট্রাক আর জেনারেশন-৩ গাড়ির কাজ শেষ করতে হবে।
তবে সেই মধ্যেই এল আরেক চমক। ২০১৯ সালের নভেম্বরে সাইবারট্রাক আনভেইলিংয়ের সময় মাস্ক জানালেন, রোডস্টারে থাকবে বিশেষ 'SpaceX প্যাকেজ' — গাড়ির চারপাশে ১০টি ছোট থ্রাস্টার, যার ফলে ০-৬০ সময় নেমে আসবে এক সেকেন্ডের কাছে, এমনকি গাড়ি একদম সংক্ষেপে হলেও ভেসে উঠবে! অনেকে তখন ভেবেছিলেন এটা মাস্কের নতুন এক মজা করা টিজ; সাত বছর পর সেই 'মজা'ই সত্যি হয়ে সামনে এল।
২০১৭ থেকেই ক্রেতারা জমা দিচ্ছেন রিজার্ভেশনের টাকা — বেস মডেলের জন্য ২০০ হাজার ডলার, সীমিত 'ফাউন্ডার্স সিরিজ'-এর জন্য ২৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ যাঁরা ২০১৭ সালে টাকা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁরা এখন প্রায় নয় বছর ধরে অপেক্ষা করছেন — আর তাঁদের অপেক্ষার পরিণতি এখনও অনিশ্চিত, কারণ পরের অংশে দেখবেন, টেসলা ডেলিভারির গ্যারান্টিই দিচ্ছে না!
অবশেষে ২০২৬ সালের এই অক্টোবরে এল প্রথম প্রকাশ্য ডেমো — গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোট সময় প্রায় নয় বছর।
মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে 'প্রথম' রোডস্টার
রোডস্টার আর মহাকাশের সম্পর্ক অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্পেসএক্সের বিশাল ফ্যালকন হেভি রকেটের প্রথম পরীক্ষা উড়ানে পেলোড হিসেবে ভরা হয়েছিল মাস্কের নিজের ২০০৮ সালের একটি চেরি-লাল রোডস্টার! স্টিয়ারিং হুইলের ওপর বসেছে 'স্টারম্যান' নামে এক স্পেসএক্স স্পেসসুট পরা মানিকজন, স্টেরিওতে বাজছে ডেভিড বোয়ির 'Space Oddity', আর ড্যাশবোর্ডে লেখা "Don't Panic"।
পৃথিবী-মঙ্গল পথ ঘিরে এলিপ্টিক্যাল সূর্যকেন্দ্রিক কক্ষপথে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই গাড়িটি। মজার ঘটনা — ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ভুল করে এই গাড়িটিকেই নতুন আবিষ্কৃত গ্রহাণু (নাম দেওয়া হয়েছিল 2018 CN41) হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, পরে ভুল ধরা পড়ে রেকর্ড প্রত্যাহার করা হয়। অর্থাৎ জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত চোখও মাঝেমধ্যে ভুল করে রোডস্টারকে মহাজাগতিক বস্তু ভেবে ফেলে!
তাই নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্স-প্রযুক্তি দেখে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই — মাস্কের কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরেই একে অন্যের প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি ধার করছে। কিন্তু এবার এই প্রযুক্তি-সেতু এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে যে ওয়াল স্ট্রিটে নতুন জল্পনার জন্ম হয়েছে — টেসলা আর স্পেসএক্স কি কোনো দিন এক হয়ে যাবে? (সেই অংশে বিস্তারিত থাকছে শেয়ারবাজার নিয়ে)।
দাম, ডেলিভারি আর আইনি ধাঁধা
এবার আসি সবচেয়ে ব্যবহারিক প্রশ্নে — দাম কত, কখন পাওয়া যাবে? উত্তরটা যতটা চমকপ্রদ, ততটা হতাশাজনক। অটোনোসিয়নের রিপোর্ট অনুযায়ী, রিজার্ভেশনের জন্য দিতে হচ্ছে ২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেপোজিট। এবং এখানেই আসে বিশ্বব্যাংক-টাইপ শর্তাবলি: দ্য ড্রাইভ ও ইনসাইডইভি-এর মতো সূত্র জানাচ্ছে, টেসলা 'গ্যারান্টি দিতে পারছে না' যে রিজার্ভেশনধারীরা কখনো গাড়ি পাবেন কি না!
ডেলিভারির সময়সীমা নিয়ে রয়টার্স জানাচ্ছে — গাড়িটি ২০২৮ সালের আগে হাতে পৌঁছাবে না। অর্থাৎ ২০১৭-তে ঘোষণা থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত এক দশকেরও বেশি সময় লাগবে। মাস্কের কোম্পানিগুলোর সময়সূচি নিয়ে বিশ্বাস কমে যাওয়ার মূল কারণও এখানেই — সাইবারট্রাক, নেক্সট-জেনারেশন সেডানসহ বহু প্রতিশ্রুতি সময়মতো পূরণ হয়নি।
আরও জটিল সমস্যা আইনের দিকটা। পলিটিকো-র রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ এফএএ জানিয়েছে — এটা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন 'বিমান' নয়। প্রশ্ন হলো তাহলে কে নিয়ন্ত্রণ করবে? সিবিএস-কে দেওয়া বক্তব্যে পরিবহন বিভাগও (ডিওটি) স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। অর্থাৎ যে গাড়ি উড়তে পারে, তার জন্য কোনো রেগুলেটরি কাঠামোই এখনও তৈরি নেই — গ্যাজেট রিভিউ-ও এই 'অমীমাংসিত নিয়ন্ত্রক প্রশ্নের' কথা বলেছে। সড়ক নিরাপত্তা, বিমান চলাচল, বীমা, দুর্ঘটনার দায় — এসব বিষয়ে আইনজ্ঞদের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
প্রশংসা বনাম সন্দেহ — দুই সুরের প্রতিক্রিয়া
ডেমোর পরপরই মিডিয়া দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদল উচ্ছ্বসিত — মোটর ট্রেন্ড লিখেছে 'রকেট-চালিত গাড়ি কীভাবে কাজ করে' শিরোনামে প্রযুক্তি-বিশ্লেষণ, কার অ্যান্ড ড্রাইভার বলছে এবারের রোডস্টার "সত্যিকারের মনে হচ্ছে"। তাঁদের যুক্তি: ০.৮১ সেকেন্ডের ত্বরণ আর উল্টে চলার মতো কসরত কোনো সিজিআই নয় — ইঞ্জিনিয়ারিং কৃতিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
অন্য দল তীব্র সন্দেহে। দ্য ভার্জ লিখেছে "দারুণ উড়ন্ত টেসলাটা আসলে কেবলই প্রদর্শনীর জন্য", এক্সপ্লোরারসওয়েব বলছে "হাইপে বিশ্বাস করবেন না", আর দি অ্যাটলান্টিক তো সরাসরি শিরোনাম দিয়েছে — "উড়ন্ত গাড়ি কোনোদিন বানানোই উচিত নয়"। সাইন্স-জার্নালিজম নিউ অ্যাটলাসের প্রশ্নটি এখনও ঝুলে আছে: "এই সব স্টান্ট কি সত্যিই 'উড়া' গণ্য হয়?"
সন্দেহের সবচেয়ে কৌশলী যুক্তিটা এল ইতিহাস থেকে। টেক-ইনসাইডার মনে করিয়ে দিয়েছে — ফ্যান দিয়ে গাড়িকে পৃষ্ঠে আটকে রাখার এই কৌশল ৫৬ বছরের পুরনো! ১৯৭০ সালে ক্যান-অ্যাম রেসিংয়ে চ্যাপারাল ২জে নামের এক রেসিং কার ঠিক এই প্রযুক্তিই ব্যবহার করেছিল — ফলাফল এতই ভয়ংকর দ্রুত ছিল যে প্রতিযোগীরা প্রতিবাদ করে ওই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করায়! অর্থাৎ রোডস্টারের 'ম্যাজিক' মূলত মহাকাশ-যুগের নয়, বরং অর্ধশতাব্দী-পুরনো মোটরস্পোর্টস প্রযুক্তিরই আধুনিক রূপ।
মজার প্রতিক্রিয়া এল ফ্লাইং-কার শিল্প থেকেও। ২০১৫ সাল থেকে কাজ করা মার্কিন স্টার্টআপ আলেফ — যারা আসলেই সত্যিকারের ফ্লাইং কার বানানোর চেষ্টায় — রসিকতা করে ভিডিও বানিয়ে 'উড়ন্ত গাড়ির প্রতিযোগিতায় টেসলাকে স্বাগতম' জানিয়েছে, যদিও সঙ্গেই জুড়েছে মশামারা প্রশ্ন: টেসলার কসরতগুলো কি আদৌ 'উড়া'? আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে।
শেয়ারবাজারে সাড়া, মার্জারের জল্পনা আর গাড়িশিল্পের নতুন লড়াই
বিনিয়োগকারীদের চোখে অবশ্য ডেমোটা পছন্দ হয়েছে। ইভেন্টের পর টেসলার শেয়ার দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বলে ইয়াহু ফাইন্যান্সসহ একাধিক সূত্র জানাচ্ছে। আরও বড় গল্পটা শুরু হলো সিএনবিসি-র রিপোর্ট থেকে — নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্স-প্রযুক্তির এত ঘন সংযোগ দেখে টেসলা ও স্পেসএক্স একীভূত হওয়ার (মার্জার) জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। তবে দুই কোম্পানির কর্পোরেট কাঠামো, মালিকানা আর নিয়ন্ত্রক জটিলতার কথা মাথায় রাখলে এমন মার্জার বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা এখনও বিশুদ্ধ অনুমানই।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এক পালকে দুই কাজ করছে দেখছে গাড়িশিল্পকে — টেসলা এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে ১ লাখ ডলারের বেশি দামের গাড়ি বিক্রির প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। অ্যাক্সিওসের বিশ্লেষণ আরও সরাসরি: "উড়ন্ত রোডস্টার দিয়ে টেসলা গাড়ির ব্যবসাকে বিদায় জানাচ্ছে" — অর্থাৎ গণ-পরিবহন বাজার থেকে টেসলা সরে যাচ্ছে বিলাসবহুল, চাঞ্চল্যকর প্রিমিয়াম বাজারের দিকে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই চালের বৈশ্বিক প্রভাবও থাকবে — চীনা ও ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ এখন কী করবে, সেটাই দেখার বিষয়।
শেষ কথা: প্রযুক্তি-বিপ্লব নাকি শুধুই শো?
যাই হোক না কেন, ইলন মাস্ক আবার প্রমাণ করলেন — বিশ্বের দৃষ্টি কাড়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো কেউ নেই। একটি গাড়ির ডেমো এক সপ্তাহ ধরে মিডিয়ার শিরোনাম, শেয়ারবাজার উত্তেজিত, মার্জারের জল্পনা, এমনকি ফ্লাইং-কার নিয়ন্ত্রণের আইন-নীতি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। অ্যাটেনশন ইকোনমির এই মাস্টারক্লাস কোনোদিন বিস্ময়কর হতে থামবে না।
কিন্তু সত্যিকারের বিচার তো হবে নির্বাচনের সময়ই। ২০২৮ সালে যদি সত্যিই রোডস্টার ক্রেতার হাতে পৌঁছায়, তাহলে মাস্ক আরেকবার ইতিহাস গড়লেন; আর যদি না পায় — ২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার জমা দেওয়া হাজারো অপেক্ষারত ক্রেতার প্রশ্নের মুখে টেসলার উত্তর কী হবে? "Cannot guarantee" — এই দুটি শব্দই যেন আজকের এই বিস্ময়কর ডেমোর আসল মোড়ক।
আমাদের দেশের পাঠকদের জন্য বলা যায় — ব্যক্তিগত গাড়ি উড়ে যাওয়া এখনও দূরের স্বপ্ন হলেও, প্রযুক্তির এই দিগন্তবিস্তার আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে: যে ভবিষ্যৎকে কল্পবিজ্ঞান ভাবতেন, সেই ভবিষ্যৎ দোর্দণ্ডপ্রতাপে আসছে। আর মাঝপথে ঘুরে বেড়ানো সেই ২০১৮ সালের লাল রোডস্টার যেন প্রতিটি সূর্য-আবর্তনে ইঙ্গিত দিয়ে যায় — মানুষের স্বপ্ন কখনও মহাশূন্যে হারায় না।
বাংলা
English