কুমারখালীর গড়াই তীরের কুণ্ডুপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এক দরিদ্র ছেলে নিজের কলম আর সুর দিয়ে বাংলার ইতিহাসে দুটি ধারারই জনক হয়ে দাঁড়ালেন — মফস্বল বা গ্রামীণ সাংবাদিকতার, আর বাউলসুরের এক স্বতন্ত্র ধারার। তিনি কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার — 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা'-র প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক, কলকাতার বাইরে পূর্ববঙ্গের প্রথম ছাপাখানার মালিক, লালন শাঁহের ভাবশিষ্য, আর বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য-গুরু।
দারিদ্র্য তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল 'কাঙাল' শব্দটি; কিন্তু সেই কাঙাল মানুষটিই ঊনিশ শতকের বাংলাকে দিয়েছেন নীলকর-জমিদারদের নির্যাতনের নির্ভীক প্রতিবেদন, প্রায় হাজারখানেক বাউল গান, আর এমন এক ছাপাখানা, যেখান থেকে প্রথম ছাপা হয়েছিল লালনের গান, এমনকি 'বিষাদ সিন্ধু'-ও। কুমারখালীর এই মহান সন্তানের সম্পূর্ণ জীবনচিত্র আর তাঁর স্মৃতিজাদুঘরের বর্তমান অবস্থা নিয়েই আজকের বিস্তারিত আয়োজন।
দারিদ্র্যের মধ্যে শৈশব
কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের জন্ম ১৮৩৩ সালে, কুমারখালীর কুণ্ডুপাড়া গ্রামে, গড়াই নদীর তীরে (তৎকালীন নদীয়া জেলা)। জন্মতারিখ নিয়ে দুটি প্রচলিত মত — বেশিরভাগ সূত্র ২২ জুলাই লেখে, প্রথম আলো লিখেছে ২০ জুলাই। পিতা হরচন্দ্র মজুমদার (কোনো কোনো সূত্রে হলধর), মাতা কমলিনী দেবী; তিনিই ছিলেন পিতামাতার একমাত্র সন্তান। ছয় মাস-এক বছর বয়সে মা আর সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন নিকটাত্মীয়দের আশ্রয়ে; পান্তভাত, জামিরপাতা আর নুনে দিন কাটত। বারো বছর বয়সে কুমারখালী বাজারের এক কাপড়ের দোকানে দুই পয়সা মাসিক বেতনে চাকরি নেন; পরে নীলকুঠিতে হিসেব-নথির শিক্ষানবিশি — প্রায় একান্নটি নীলকুঠির হেড অফিস হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে। নীলকরদের হাতে কৃষকের নির্যাতন নিজ চোখে দেখে সেই চাকরিই ছেড়ে দেন — এই নীলকুঠি-অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর লেখা আর তাঁর পত্রিকা দুটোরই প্রাণ হয়ে ফিরে আসবে।

কুমারখালী — কাঙ্গাল হরিনাথের জন্ম ও কর্মক্ষেত্র (ছবি: কুষ্টিয়াশহর.কম)
শিক্ষা ও বিনাবেতনে শিক্ষকতা
শৈশবে স্থানীয় এক ইংরেজি স্কুলে (কৃষ্ণনাথ মজুমদারের স্কুল) কিছুকাল পড়ার সুযোগ হলেও দারিদ্র্যে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ব্রাহ্ম প্রচারক দয়ালচাঁদ শিরোমণির কাছে তিনি বাংলা ব্যাকরণ, তত্ত্ববোধিনী, বেতাল পঞ্চবিংশতি পাঠ করেন — স্বশিক্ষাই তাঁর প্রকৃত শিক্ষা। ১৮৫৫ সালের ১৩ জানুয়ারি বন্ধুদের (গোপাল কুণ্ডু, যাদব কুণ্ডু, গোপাল স্যান্যাল) সহায়তায় নিজ গ্রামে খোলেন ভার্নাকুলার বিদ্যালয় — বিনাবেতনে শেখাতেন তিনি। মাত্র দু'বছরের মাথায়, ১৮৫৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর, কৃষ্ণনাথ মজুমদারের সহযোগিতায় খোলা হয় বালিকা বিদ্যালয় — বর্তমান কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়; বাংলা ট্রিবিউন-প্রথম আলোর বর্ণনায় যেটি ছিল পূর্ববঙ্গের প্রথম নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর হরিনাথই ছিলেন সেখানকার প্রথম শিক্ষক। উল্লেখযোগ্য, এই বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে সূত্রে সূত্রে কিছু পার্থক্যও মেলে।
এই পাঠশালাতেই শিক্ষা শুরু করেন পরবর্তী কালের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় — ইংরেজি বাংলাপিডিয়া সরাসরি লেখে, মৈত্রেয় শিক্ষা শুরু করেছিলেন কুমারখালীতে "অনন্য গুণী হরিনাথ মজুমদারের" কাছেই। শিক্ষক থেকে সাংবাদিক, কবি থেকে বাউল — এই পালাবদলের বীজ তখনই বপন হয়েছিল।
গ্রামবার্তা প্রকাশিকা: মফস্বল সাংবাদিকতার জনক
লেখালেখির শুরু ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর'-এ। তারপর ১৮৬৩ সালের এপ্রিলে কুমারখালী থেকে বেরোয় তাঁর নিজের পত্রিকা 'গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা' — প্রথমে মাসিক (চার ফরমার মূল্য পাঁচ আনা), ১৮৬৪ সালে পাক্ষিক, ১৮৭১ সালে এক পয়সা মূল্যের সাপ্তাহিক। মুদ্রণ শুরুতে হত কলকাতায়; পরে মুদ্রণও নেমে আসে কুমারখালীতেই। গ্রামের মানুষের হাতে কলমে রাজ্য-প্রশাসন, নীলকর, জমিদার আর মফস্বল-সমাজের খবর পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াসের জন্যই কাঙ্গাল হরিনাথ ইতিহাসে 'মফস্বল বা গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক' হয়ে থেকে গেলেন। তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সাহসের সাক্ষ্য একটি ঘটনাই যথেষ্ট — পাবনার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট হামফ্রেকে নিয়ে তিনি 'গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট' শিরোনামেই প্রতিবেদন ছাপিয়েছিলেন।
নীলকর-জমিদারদের ভীতি-প্রদর্শন আর সরকারের কঠোর মুদ্রণ-শাসনের মধ্যে পত্রিকাটি চলেছিল আঠারো বছর; রাজশাহীর রাণী স্বর্ণকুমারী দেবীর অর্থানুকূল্যও তাঁকে জুটিয়ে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত আর্থিক দুরবস্থায় ১২৯২ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে (১৮৮৫) গ্রামবার্তা প্রকাশিকা বন্ধ হয়ে যায়।
মথুরানাথ প্রেস: কলকাতার বাইরে প্রথম ছাপাখানা
কুমারখালীর এই সাংবাদিকতা-স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হলো মুদ্রণযন্ত্র। ১৮৬৪ সালে কুমারখালীতে গড়ে ওঠে মথুরানাথ প্রেস; ১৮৭৩ সালে তার স্থান নেয় 'এমএন প্রেস' — এই প্রেস-স্থাপনের গল্পে দুটি বর্ণনা চলে: মথুরানাথ মৈত্রেয় (অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের পিতা) প্রেসটি হরিনাথকে দান করেন, অথবা মৈত্রেয়ের অর্থানুকূল্যে হরিনাথ নিজেই মৃত বন্ধু মথুরানাথ মজুমদারের স্মরণে প্রেসটি স্থাপন করেন। প্রথম আলোর বর্ণনায়, যন্ত্রটি ছিল লন্ডনের ক্লাইম্যান (কলম্বিয়া ডিক্সন) কোম্পানির তৈরি — ১৮৬৭ সালের নির্মিত মডেল ১৭০৬; নিলামে রাণী স্বর্ণকুমারীর অনুকূল্যে ৬০০ টাকায় কেনা হয়। তখন কলকাতার বাইরে বাংলায় আর কোথাও ছাপাখানা ছিল না — পূর্ববঙ্গের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র এইটই।
এই প্রেসের সঙ্গে কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগটি এখানেই বলা যায় — ফকির লালন শাঁহের প্রায় একুশটি গান, যার মধ্যে 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি'ও আছে, প্রথম কাগজে ছাপা হয়েছিল এই এমএন প্রেস থেকেই। আর মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ সিন্ধু'র প্রথম মুদ্রণও হয়েছিল এখানে — কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, মীর প্রেসের ঘরে বসেই অংশ লিখেছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বোমায় কুণ্ডুপাড়ার কাঙাল কুটির ও প্রেস-ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাহিত্যকর্ম: আঠারোটি মুদ্রিত গ্রন্থ
বাংলাপিডিয়ার তালিকায় কাঙ্গাল হরিনাথের মুদ্রিত গ্রন্থ আঠারোটি। উল্লেখযোগ্যগুলো: 'বিজয়বসন্ত' (১৮৫৯), 'চারুচরিত্র' (১৮৬৩), 'কবিতাকৌমুদী' (১৮৬৬), 'বিজয়া' (১৮৬৯), 'কবিকল্প' (১৮৭০), 'অক্রূর সংবাদ' (১৮৭৩), 'সাবিত্রী নাটিকা' (১৮৭৪), 'চিত্তচপলা' (১৮৭৬), 'কাঙালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ' (১৮৮৭-৯৫) আর শেষ জীবনের 'মাতৃমহিমা' (১৮৯৬); মৃত্যুর পরে ১৯০১ সালে বেরোয় 'হরিনাথ গ্রন্থাবলী'। বাউলগানে তিনি 'কাঙাল' ভণিতা ব্যবহার করতেন — শৈশবের দারিদ্র্য আর এই ভণিতাই তাঁর নামের সঙ্গে 'কাঙ্গাল' শব্দটি জুড়ে দিয়েছে।
কাঙাল ফকির সূর সম্প্রদায় ও বাউলসুর
কাঙ্গাল হরিনাথ ছিলেন ফকির লালন শাঁহের শিষ্য-সম্প্রদায়ের মানুষ। ১৮৮০ সালে (১২৮৭ বঙ্গাব্দ) অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের অনুপ্রেরণায় তিনি গড়ে তোলেন 'কাঙ্গাল-ফিকিরচাঁদের দল' — প্রচলিত নামে 'কাঙাল ফকির সূর সম্প্রদায়'। 'ফকিরচাঁদ বাউল' ভণিতায় তিনি রচনা করেছিলেন প্রায় হাজারখানেক গান; বাংলাপিডিয়ার মতে গীতাবলী প্রকাশিত হয়েছিল ষোলো খণ্ডে (১২৯০/৯৩–১৩০০ বঙ্গাব্দ)। পরে পুত্র সতীশচন্দ্র মজুমদার ও জলধর সেন আলাদা আলাদা সংকলন প্রকাশ করেন।
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গানটি আজও প্রতিটি বাঙালির মুখে মুখে — "হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার কর আমারে" — সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী' চলচ্চিত্রেও এই গানই ব্যবহৃত হয়েছে; 'দোকানী ভাই দোকান সার না' গানটি ১৯৪০ সালেই রেকর্ড হয়ে যায়। লোকমুখে প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, লালন শাঁহ হরিনাথের গান শুনে মন্তব্য করেছিলেন — "তোমার এ ব্যঞ্জন বেশ হইয়াছে, তবে নুনে কিছু কম আছে।" অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তাঁর শিক্ষককে নিয়ে লিখেছিলেন — "এমন যে হইবে তাহা ভাবি নাই। এমন করিয়া যে দেশের জনসাধারণের হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত করা যায়।" আর জলধর সেনের ভাষায়, কাঙ্গাল হরিনাথ "পূবর্ববঙ্গের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার নিকটে তাঁর বাউলসঙ্গীতের দ্বারাই... লোক বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন।"
মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যগুরু
গ্রামবার্তা প্রকাশিকার মাধ্যমেই সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন বাংলার প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেন — তিনি ছিলেন পত্রিকাটির মফস্বল সংবাদদাতা। বাংলাপিডিয়া সরাসরি বলে, মীর মশাররফের সাহিত্যজীবনের প্রত্যক্ষ প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন মূলত গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা-সম্পাদক কাঙাল হরিনাথের কাছ থেকেই। মীর মশাররফ নিজে আত্মজীবনীতে লিখেছেন — "হরিনাথবাবু মহাশয় আমাকে কনিষ্ঠ ভ্রাতার ন্যা স্নেহ করিতেন।" 'বিষাদ সিন্ধু'র প্রথম মুদ্রণও হয়েছিল হরিনাথের এমএন প্রেসে। কুমারখালীর এই গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সাহিত্য-ইতিহাসের অন্যতম শ্রেয় অধ্যায় — মীর মশাররফ হোসেন নিয়ে আমাদের বিস্তারিত প্রবন্ধ-এ সেই গল্পের অন্য পাশটাও আছে।
রবীন্দ্রনাথের নজরে
কাঙ্গাল হরিনাথের কাজকর্ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নজর এড়ায়নি — প্রথম আলোর প্রত্যক্ষদর্শী প্রবন্ধের বর্ণনা অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ হরিনাথের দুই হাজার পৃষ্ঠার দিনলিপি পড়েছিলেন; সুরেশচন্দ্র মৈত্রের 'বাংলা কবিতার নবজন্ম' গ্রন্থের সূত্রে জানা যায়, কাঙালের বাউলগান রবীন্দ্রনাথকেও স্পর্শ করেছিল। লোকমুখে আরও একটি প্রবাদ চলে যে রবীন্দ্রনাথ হরিনাথকে শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে নিতে লাঠিয়াল পাঠিয়েছিলেন — bdnews24-এর মতে এই কাহিনিটি ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত। কথাটা তাই লোকমুখের কথা হিসেবেই নিতে হবে।
শেষ জীবন ও প্রয়াণ
শেষ জীবনটা কেটেছে আগের চেয়েও সাধে-সঙ্গে। ১৮৯৬ সালের ১৬ এপ্রিল (১৩০৩ বঙ্গাব্দের ৫ বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়া) বিকেলে তিনি মারা যান — প্রথম আলোর বর্ণনায় মৃত্যু হয় বৃহস্পতিবার দুপুর-পরবর্তী সময়ে, কাঙাল কুটিরে; কোনো কোনো তথ্যছকে ১৮ এপ্রিল লেখা থাকলেও ১৬ এপ্রিলই বাংলাপিডিয়ার স্বীকৃত তারিখ। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল — অগ্নিসংস্কার পুরো না করে, হাতের কনিষ্ঠা-খুলি-বুড়ো আঙুলসহ ভস্ম পূজার ঘরে সমাহিত করা; কুণ্ডুপাড়ার নিজ বসতভিটায় সেই সমাধিঘর আজও আছে। তাঁর মৃত্যুতে ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকায় শোকবার্তা ছাপা হয়েছিল — "নদীয়া জেলাবাসী আজ তাঁদের একজন অত্যন্ত মহান ও নিঃস্বার্থ সুসন্তানকে হারাল।"
স্মৃতি জাদুঘর ও বর্তমান অবস্থা
কুমারখালী পৌরসভার ভেতরে গড়ে উঠেছে কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর — বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের শাখা হিসেবে (সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে) ২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রায় আটাশ শতক জমির প্রতিষ্ঠানটির এক গ্যালারিতে রাখা আছে একশো সত্তরটি নিদর্শন। সবচেয়ে মূল্যবান সংগ্রহ অবশ্য এমএন প্রেসের সেই ঐতিহাসিক মুদ্রণযন্ত্র — ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই জাতীয় জাদুঘর বংশধরদের কাছ থেকে যন্ত্রটি কিনে নেয় (২০ লাখ টাকা এবং দুটি চাকরির বিনিময়ে), আর তাঁর ১৯০তম জন্মবার্ষিকীতে — ২০ জুলাই ২০২৩ — যন্ত্রটি জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য খুলে দেওয়া হয়।

কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর, কুমারখালী — সামনে তাঁর অর্ধমূর্তি (ছবি: কুষ্টিয়াশহর.কম)
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যত্নের অভাবে দিন কাটাচ্ছে — গত কয়েক বছরে 'জনবল সংকটে ধুঁকছে কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর', 'মুছে যাচ্ছে কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি'-জাতীয় শিরোনামে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে (যুগান্তর, বনিক বার্তা ইত্যাদি, ২০২৫-২৬)। প্রয়াণদিবসে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের অভাবের খবরও ছাপা হয়েছে। কুণ্ডুপাড়ার কাঙাল কুটির, এমএন প্রেস-ভবন আর সমাধিঘর তখনও পুরনো অবহেলারই সাক্ষী।
উপসংহার
কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার এক জীবনে চারটি ভূমিকা পালন করেছেন — বিনাবেতনের শিক্ষক, মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, পূর্ববঙ্গের প্রথম ছাপাখানার মালিক, আর হাজারখানেক বাউলগানের স্রষ্টা। তাঁর পত্রিকার প্রথম মফস্বল সংবাদদাতার কলমে জন্ম নিয়েছিল 'বিষাদ সিন্ধু', তাঁর প্রেস থেকেই প্রথম কাগজে ছাপা হয়েছিল লালনের গান — কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কতগুলো সুতো যে এক জন দরিদ্র কুমারখালীবাসীর জীবনে গাঁথা, জানার পর বিস্ময়টা বাড়ে। কুমারখালীর জাদুঘর যত্ন চাই, কুণ্ডুপাড়ার স্মৃতিভবন যত্ন চাই — তার চেয়ে বড় কথা, তাঁর গানগুলো যতদিন মানুষের মুখে মুখে ফিরবে, কাঙ্গাল হরিনাথ ততদিন পার করে দেবেন না আমাদের কাউকে।
তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ
- বাংলাপিডিয়া — "হরিনাথ, কাঙাল" (শিপ্রা দস্তিদার): bn.banglapedia.org
- বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি) — "Harinath, Kangal": en.banglapedia.org
- বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি) — "Grambarta Prakashika": en.banglapedia.org
- বাংলা উইকিপিডিয়া — গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা: bn.wikipedia.org
- বাংলা উইকিপিডিয়া — কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর: bn.wikipedia.org
- প্রথম আলো — "কাঙ্গাল হরিনাথের জীবন ও সংগ্রাম" (রচনা, ২০২৬): prothomalo.com
- প্রথম আলো — "প্রেস সংরক্ষণের অপেক্ষায় কাঙ্গাল হরিনাথ" (জুলাই ২০২৩): prothomalo.com
- প্রথম আলো — প্রত্যক্ষদর্শী প্রবন্ধ (২০২২): prothomalo.com
- bdnews24 বাংলা — কাঙ্গাল হরিনাথ নিয়ে বিস্তারিত: bangla.bdnews24.com
- ডেইলি স্টার বাংলা — "গুরু কাঙ্গাল হরিনাথ": bangla.thedailystar.net
- কালি ও কলম — "কাঙাল হরিনাথ: বাউলগানের অনন্য সাধক": kaliokalam.com
- দ্য রিপোর্ট — "মফস্বল সাংবাদিকতার জনক কাঙাল হরিনাথ": bn.thereport.live
বাংলা
English
