ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত হলো ‘লালন সন্ধ্যা’। ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “দিশেহারা জাহাজের জন্য লাইটহাউস যেমন দিকনির্দেশক, লালন সাঁইও তেমন মানবজাতির আলোকবর্তিকা।” তাঁর মতে, বিভেদ আর সংকীর্ণতায় দিশেহারা আজকের মানবসমাজ যেন পথ হারানো জাহাজ — লালনের দর্শনই তাকে পথ দেখানোর বাতিঘর।
হাইকমিশনারের ভাষায়, লালনের দর্শন সার্বজনীন মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। “সামাজিক ও ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে লালনের গান আমাদের মানবতাবোধের শিক্ষা দেয়” — এই মন্তব্যে তিনি লালনের মানবতাবাদী দর্শনকে ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন বলেছেন। তিনি আরও বলেন, লালনকে শুধু বিশেষ দিনে নয়, প্রতিদিন স্মরণ করা উচিত।
সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে প্রথমেই মঞ্চে ওঠেন লোকসংগীত শিল্পী শফি মণ্ডল ও তাঁর দল, পরিবেশন করেন বাউল গান। এরপর প্রয়াত লালনগায়িকা ফরিদা পারভীনের স্বামী বাঁশিবাদক গাজী আবদুল হাকিম বাঁশিতে ফুটিয়ে তোলেন গ্রামবাংলার লোকসুর, সঙ্গে মিশে যায় কণ্ঠশিল্পী নাসরিন আক্তার বিউটির লালনগীতি। ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’র শিক্ষার্থীদের সমবেত গানের পর দেশজনপ্রিয় ব্যান্ড ‘লালন’-এর পরিবেশনায় সারাসন্ধ্য পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে — বাঁশি আর লালনের গানে ফুটে ওঠে লোকসংগীতের জীবন্ত ঐতিহ্য।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহমেদ সোহেল মনজুরসহ দুই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১ কার্তিক ১২৯৭ বঙ্গাব্দে (১৭ অক্টোবর ১৮৯০) কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের তিরোধান ঘটে। সেই স্মরণে এ বছর ১৭–১৯ অক্টোবর লালন আখড়ায় পালিত হয়েছে তিন দিনব্যাপী ১৩৬তম তিরোধান উৎসব — আখড়াপ্রাঙ্কণ তখন ভরে উঠেছিল দেশ-বিদেশের সাধক, ভক্ত আর সংগীতপ্রেমীদের ঢলে। ঢাকার ‘লালন সন্ধ্যা’ তারই বর্ধিত ধারা।
লালনের গান যুগ ধরে শিখিয়ে আসছে জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই সাধকের গানে মুগ্ধ হয়ে তা নিজের লেখায় জায়গা করে দিয়েছিলেন; ২০০৮ সালে বাউল গান জায়গা পায় ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় — তার কেন্দ্রে লালন।
আইজিসিসির উদ্যোগে গত বছরও ঢাকায় আয়োজিত হয়েছিল লালন সন্ধ্যা; সেখানে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল প্রয়াত লালনশিল্পী ফরিদা পারভীনকে। এবারের আয়োজনে ভারতীয় হাই কমিশনের সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে লালনের জায়গাটা আবারও প্রতিষ্ঠিত হলো।
তথ্যসূত্র: bdnews24, ATN News, যুগান্তর প্রতিবেদন।
বাংলা
English
