“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

লালনের দর্শন ও মানবিক চেতনা ধারণ করে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান - প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত
  • Sub Title: মানবতার বাণীতে বিদায়ের সুর — ছেঁউড়িয়ায় ১৩৬তম তিরোধান দিবস ও লালন মেলার সমাপ্তি

মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণীতে মুখরিত ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি। হাজারো বাউল-সাধু, লালনভক্ত ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে তিন দিনের আয়োজন শেষ হয়েছে গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায়। মাজার প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়, গান-সাধনা, আলোচনা আর লালনকে ঘিরে আবেগময় স্মৃতিচারণ।

সোমবার বিকেল ৪টায় লালন মাজার মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বক্তব্যে তিনি বলেন- ফকির লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন ও আদর্শ সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লালনের গান, বাণী ও তাত্ত্বিক চিন্তা মানুষের কল্যাণ, সমাজের উন্নয়ন এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পরিধি বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। লালনের দর্শন ও মানবিক চেতনা ধারণ করে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রধান অতিথি অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও লালনকে ঘিরে কুষ্টিয়াবাসীর গর্ব ও শ্রমের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে সাহিত্য, মানবতা, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে মানুষের সেবা ও কল্যাণের গুরুত্ব উঠে আসে। লালনের দর্শনের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. আহমেদ শফিক হাসামী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার। আলোচনায় অংশ নেন নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খালেদ উজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মিজানুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসান।

১৩৬তম তিরোধান দিবসের সমাপনী আলোচনা সভার মঞ্চ

১৩৬তম তিরোধান দিবসের সমাপনী আলোচনা সভার মঞ্চ।

তিন দিনের উৎসব ঘিরে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি পরিণত হয় বাউল-সাধু ও লালনভক্তদের মিলনকেন্দ্রে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে মাজার প্রাঙ্গণ। কেউ এসেছেন প্রিয় সাধকের স্মরণে, কেউ লালনের গান শুনতে, আবার কেউ তাঁর মানবতাবাদী দর্শনের টানে। বাউলদের কণ্ঠে লালনের গান আর আখড়ার পরিবেশে সাধুসঙ্গের আবহ তৈরি করে এক ভিন্ন অনুভূতি। ভক্তদের কাছে লালন কেবল একজন সাধক নন; তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে ফেরার দর্শন। জাত-পাত, ধর্মীয় বিভেদ ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে শিক্ষা লালন দিয়ে গেছেন, সেই বাণীই তাঁদের টানে ছেঁউড়িয়ায়। বছরের পর বছর ধরে এই আখড়াবাড়িতে ফিরে আসেন অনেকে। কারও কাছে এটি আত্মার শান্তি খোঁজার জায়গা, কারও কাছে শেকড়ের টান, আবার কারও কাছে প্রিয় গুরুর স্মৃতির সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের উপলক্ষ। উৎসবের দিনগুলোতে মাজার চত্বর ও আশপাশের এলাকায় ছিল আলোকসজ্জা। লালন মেলাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও দেখা যায় উৎসবের আমেজ। দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে বাড়ে মানুষের উপস্থিতি। মেলা ঘিরে দোকানপাট, খাবারের আয়োজন ও নানা পণ্যের পসরা বসে। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় বাড়তি ব্যস্ততা।

উৎসবের শেষ পর্বে নিরাপত্তা-প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে। আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে লালনভক্তদের তীক্ষ্ণ নজরেই একটি বোমাসদৃশ বস্তু চোখে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীকে অবগত করা হয়। জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা থেকে এসে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করে। তবে এর মাঝেই কিছু গুজব-সৃষ্টিকারী মহল অনুষ্ঠানটিকে কলুষিত করার জন্য অনলাইনে দিন-রাত মিথ্যা তথ্য প্রচার করে, যা ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক। সবার সচেতনতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হয়নি।

উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসান। তিনি বলেন, সীমিত পরিসরে বৃহৎ এই আয়োজন সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। সবার সহযোগিতায় তা সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে লালন স্মরণোৎসব ও মেলাকে আরও গতিশীল, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল, বাউল-সাধু সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক, সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক। বিপুল মানুষের সমাগম সামলানো, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার মতো বড় কর্মযজ্ঞে সবার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানান তিনি।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, লালন জাত-পাত ও ভেদাভেদ ভুলে সব মানুষের কল্যাণের কথা বলেছেন। তিনি সব সৃষ্টিজীবের সুখ, শান্তি ও মঙ্গলের কথা বলেছেন এবং মানুষকে ভালো ও সরল পথে চলার শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ যারা মানুষকে নিন্দা ও বিভেদের পথে ঠেলে দেন, তারাই প্রকৃত অর্থে দুর্ভাগা। দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজারো লালনভক্ত ও দর্শনার্থীকে কুষ্টিয়াবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, অতিথিরা কুষ্টিয়াবাসীর আতিথেয়তা ও আন্তরিকতা নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবেন এটাই তাঁর প্রত্যাশা। একই সঙ্গে তাঁরা কুষ্টিয়ার সুনাম, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের স্মৃতি সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) উপসচিব মিজানুর রহমান বলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে লালনকে ঘিরে কুষ্টিয়ায় প্রতিবছর দুটি বৃহৎ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনের সফল বাস্তবায়নে কুষ্টিয়াবাসীর আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও সম্মিলিত সহযোগিতার প্রতিফলন ঘটে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও যেকোনো প্রতিকূল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়াবাসী একইভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে পাশে থাকবেন এবং নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থেকে আয়োজনকে সফল করতে সহযোগিতা করবেন।

বাউল-সাধু ও লালনভক্তদের কাছে তিন দিনের এই আয়োজন ছিল প্রিয় সাধকের স্মরণে মিলিত হওয়ার এক বিশেষ উপলক্ষ। কেউ ফিরেছেন গানের স্মৃতি নিয়ে, কেউ সাধুসঙ্গের অভিজ্ঞতা নিয়ে, কেউবা লালনের মানবতাবাদী দর্শনকে নতুন করে উপলব্ধি করার তাগিদ নিয়ে। লালনের আখড়াবাড়িতে উৎসব শেষ হলেও তাঁর গান ও দর্শনের আবেদন শেষ হয় না। সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে বাণী তিনি রেখে গেছেন, তা সমাজে কতটা ধারণ করা যাচ্ছে সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে আসে। উৎসবের শেষ সুরে ফিরে এসেছে লালনের সেই চিরন্তন আহ্বান মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পথে চলা।

Comments

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন