“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল
মোহিনী মিল: ঐতিহাসিক অতীত ও বর্তমান চিত্র
  • Sub Title: ১৯০৮-এ প্রতিষ্ঠা, আশির দশকে বন্ধ — এখন পুনরুদ্ধারের নতুন প্রতিশ্রুতি

কুষ্টিয়া শহরের শিল্প-ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে যে প্রতিষ্ঠানটির নাম বিশেষভাবে উঠে আসে, সেটি হলো মোহিনী মিল। একসময় এই বস্ত্রকল শুধু কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি, বরং বৃহত্তর অঞ্চলের তাঁতি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। মিলটির উৎপাদিত সুতা, শাড়ি ও ধুতি একসময় পরিচিতি লাভ করেছিল বিভিন্ন এলাকায়। কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

আজ সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, অব্যবহৃত অবকাঠামো এবং সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে। একসময় যে মিলের চাকা ঘিরে অসংখ্য মানুষের জীবিকা আবর্তিত হতো, তার বর্তমান অবস্থা কুষ্টিয়ার শিল্প-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।

মোহিনী মিল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মিল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পোদ্যোক্তা মোহিনী মোহন চক্রবর্তীর নাম। বিভিন্ন প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণ ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯০৮ সালে তিনি কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়া এলাকায় প্রায় ৩৩ একর জমির ওপর একটি বস্ত্রকল প্রতিষ্ঠা করেন; শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি ‘চক্রবর্তী এন্ড সন্স’ নামে পরিচিত ছিল। কুষ্টিয়াশহর.কমে প্রকাশিত ইতিহাস-গবেষণার নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯১২ সালে এটি ‘কুষ্টিয়া মোহিনী মিলস লিমিটেড’-এ রূপান্তরিত হয় এবং শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ছিলেন জগৎকিশোর চৌধুরী ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; মিলের উত্তরে আরও আগে ঠাকুর-পরিবারের সংস্থা ‘টেগোর এন্ড কোম্পানি’ ছিল বলেও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলার অর্থনীতি কৃষি, তাঁতশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। ১৯০৫-০৬-এর স্বদেশী আন্দোলন ও বিলাতি পণ্য বর্জনের প্রেক্ষিতে দেশীয় মিল-কারখানা গড়ে ওঠার ধারারই অংশ হিসেবে মোহিনী মিলকে দেখে স্থানীয় ইতিহাস-গবেষকেরা। সে সময় স্থানীয়ভাবে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের জন্য আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মোহিনী মিল সেই সময়ের শিল্পায়নের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

কুষ্টিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল। রেল যোগাযোগ ও নদীপথের সুবিধা ব্যবহার করে কাঁচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করার সুযোগ ছিল। এসব সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মোহিনী মিল ধীরে ধীরে একটি পরিচিত বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

প্রতিষ্ঠার সাল, কোম্পানির আনুষ্ঠানিক নাম এবং পরবর্তী মালিকানা পরিবর্তন সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তাই মিলটির ইতিহাস অনুসন্ধানে সমসাময়িক নথি, সরকারি দলিল ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বিবরণ মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মোহিনী মিলের ভূমিকা

মোহিনী মিলের প্রধান কাজ ছিল সুতা ও কাপড় উৎপাদন। বিভিন্ন প্রকাশিত বিবরণে মিলটির উৎপাদিত শাড়ি, ধুতি ও সুতার সুনামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁতিরা সুতা সংগ্রহের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতেন বলে স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক লেখায় উঠে এসেছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়া এলাকায় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ গড়ে ওঠে। মিলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের পাশাপাশি পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, ব্যবসা এবং অন্যান্য সহায়ক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।

বস্ত্রকলের উৎপাদন কেবল কারখানার অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উৎপাদিত সুতা ও কাপড় বাজারে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন হতো পরিবহনব্যবস্থা, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবার। ফলে মোহিনী মিলকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলেছিল।

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন চালিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে এলাকার মানুষের স্মৃতি, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। মোহিনী মিলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। বহু মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি কারখানা নয়; এটি কুষ্টিয়ার অতীত শিল্পসমৃদ্ধির স্মারক।

শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক

মোহিনী মিলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর শ্রমিকসমাজ। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে শ্রমিক, কারিগরি কর্মী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজন হতো। তাঁদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই মিলটির উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। স্থানীয় ইতিহাস-গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, একসময় এই মিল কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কেন্দ্র ছিল; তিরিশের দশকে এখানে মোহিনী মিল সুতাকল মজদুর ইউনিয়ন গড়ে ওঠে এবং শ্রমিকনেতা কমরেড রওশন আলীর আবির্ভাব ঘটে।

মিলের কার্যক্রম সচল থাকাকালে এর সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবার নিয়মিত আয়ের সুযোগ পেয়েছিল। শ্রমিকদের আয় স্থানীয় দোকানপাট, বাজার, বাসস্থান, পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক কর্মকাণ্ডেও অর্থের প্রবাহ তৈরি করত। এভাবেই একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তার আশপাশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস শুধু উৎপাদন ও সাফল্যের গল্প নয়। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সমস্যাও এর অংশ। মোহিনী মিলের দীর্ঘ ইতিহাস বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পাশাপাশি শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন সময়ের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকটও বিবেচনায় নিতে হবে।

জাতীয়করণ ও মোহিনী মিলের পরিবর্তিত পরিস্থিতি

প্রতিষ্ঠাতা মোহিনী মোহন চক্রবর্তীর মৃত্যুর (১৯২২) পর নাতি দেবীপ্রসাদ চক্রবর্তী — পরিচিত নাম ‘কানু বাবু’ — প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন বলে স্থানীয় ইতিহাস-গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় মিলটি ‘শত্রু সম্পত্তি’ ঘোষিত হয় এবং কানু বাবুকে পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে গৃহবন্দী করে মিলের নিয়ন্ত্রণ নেয় সরকারি প্রশাসন; তিনি ১৯৬৭ সালে গৃহবন্দী অবস্থাতেই মারা যান। মিলকে ঘিরে ওই সময়ে গড়ে ওঠা মিল লাইন, বাজার, হাসপাতাল ও থিয়েটার হল কুষ্টিয়া শহরের নগরায়ণেরও অংশ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে। মোহিনী মিলও এর বাইরে ছিল না। প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয় এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে।

জাতীয়করণের পর প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হলেও পরবর্তী সময়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ, যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা, বাজারে প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হলে একটি বড় কারখানার কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

মোহিনী মিলের ক্ষেত্রেও লোকসান ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সংকটের কথা বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও ইতিহাসবিষয়ক লেখায় উঠে এসেছে। তবে এসব সমস্যার নির্দিষ্ট কারণ ও দায় নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি নথি, আর্থিক প্রতিবেদন এবং শ্রমিকদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

১৯৮২ সালে উৎপাদন বন্ধ

মোহিনী মিলের ইতিহাসে আশির দশক একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে মিলটির নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ২০১০ সালের একটি বিডিনিউজ24 প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে বন্ধ হওয়ার পর ১৯৮৫ সালে মিলটি আবার চালু হয়েছিল এবং পরে লোকসানের কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায় — ওই প্রতিবেদনে শেষ বন্ধ হওয়ার সময় বলা হয়েছে ১৯৯০ সালের ১৫ আগস্ট। অন্যদিকে কুষ্টিয়াশহর.কমের ইতিহাস-গবেষণায় মিলটিকে অচল হওয়ার সময় ধরা হয়েছে ১৯৮৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে। হুবহু তারিখ নিয়ে সূত্রে সূত্রে পার্থক্য থাকলেও অচলাবস্থার সূচনা আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগের মধ্যেই — বিষয়টি প্রায় সব বিবরণেই মেলে।

একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু কারখানার সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মসংস্থান হারানো, পরিবারের আয় কমে যাওয়া, স্থানীয় বাজারে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার মতো প্রভাব দেখা দিতে পারে। মোহিনী মিল বন্ধ হওয়ার ঘটনাও কুষ্টিয়ার শিল্প ও শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তী সময়ে মিলটির সম্পত্তি, মালিকানা ও পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও কার্যক্রম হয়েছে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে কারখানার যন্ত্রপাতি, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পুনরায় চালুর উদ্যোগ ও শাহ মখদুম টেক্সটাইল মিলস

মোহিনী মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১০ সালের ২১ মে প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর কারখানাটি ‘মেসার্স শাহ মখদুম টেক্সটাইল মিলস’ নামে আবার চালু করা হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের কাছ থেকে মিলটি ইজারা নিয়ে পরিচালনা করে পিলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস করপোরেশন লিমিটেড এবং ২১ মে সকালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান উৎপাদন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রায় দুই দশক বন্ধ থাকার পর এটি ছিল মিল পুনরুজ্জীবনের এক আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।

তবে পুনরায় চালু হওয়ার উদ্যোগ মানেই দীর্ঘমেয়াদে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল হয়ে যাওয়া নয়। নিয়মিত উৎপাদন বজায় রাখতে প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল, বাজারের চাহিদা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা।

মোহিনী মিলের ক্ষেত্রেও পুনরায় চালুর উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তী বছরগুলোর সংবাদ প্রতিবেদনে মিলটির বারবার হাতবদল এবং উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি সচল না হওয়ার কথা উঠে এসেছে।

এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, ঐতিহাসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু নাম পরিবর্তন বা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবসম্মত শিল্পোন্নয়ন কৌশল।

মালিকানা, সম্পত্তি ও আইনি জটিলতা

মোহিনী মিলের ইতিহাসে মালিকানা ও সম্পত্তিসংক্রান্ত জটিলতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম আলোর জানুয়ারি ২০২৪-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ১৯৮১ সালের জুনে লিকুইডেশন সেল বা বিলুপ্তির দপ্তর গঠন করে, যার কাজ ছিল এই কারখানাসহ চারটি কারখানা বিক্রি করা। কিন্তু চার দশক পেরিয়েও মোহিনী মিল বিক্রি হয়নি। প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ২০১১ সালের দিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলটি হস্তান্তরের উদ্যোগ হয়েছিল; তবে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কমে (প্রায় ২০ কোটি টাকায়) বিক্রির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশে এটি সরকার ফেরত এনেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি এখন লিকুইডেশন সেলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে তার জমি, ভবন, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ওই প্রথম আলো প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ধ হওয়ার পর থেকে মিলের জমি বেদখল হতে থাকে; প্রায় অর্ধেক জমি এখন আর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেই — সাড়ে ১৬ একরের মতো জমি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলা হয়েছে। মালিকানা নিয়ে বিরোধ, আর্থিক দায়, আইনি নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করার উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মোহিনী মিলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে সম্পত্তি হস্তান্তর ও পুনরায় চালুর উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি শিল্পকার্যক্রম নিশ্চিত করা যায়নি।

সম্পত্তি ও মালিকানা নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আদালতের আদেশ, চুক্তিপত্র এবং হালনাগাদ প্রশাসনিক তথ্য যাচাই করা জরুরি। কেবল সংবাদ প্রতিবেদন বা স্থানীয় জনশ্রুতির ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

পরিত্যক্ত অবকাঠামো ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মোহিনী মিলের ভবন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভোরের কাগজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, পরিত্যক্ত কারখানার মূল্যবান সম্পদ ও যন্ত্রাংশ হরিলুট হচ্ছে — ইংল্যান্ড থেকে আনা পিতলের হ্যান্ডলুম মেশিনসহ যন্ত্রাংশ চুরি যাচ্ছে, লক্ষাধিক টাকার তার কাটা পড়েছে, ভবনের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খুলে নেওয়া হচ্ছে; ভবনগুলো জরাজীর্ণ, মিলচত্বর জঙ্গলে পরিণত। ওই প্রতিবেদনে মিলের ৯৯ বিঘা জমির বর্তমান বাজারদর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ রয়েছে।

একটি ঐতিহাসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূল্য শুধু তার জমি বা ভবনের বাজারদর দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রযুক্তির ইতিহাস, শ্রমিকদের জীবন, স্থানীয় অর্থনীতির বিবর্তন এবং একটি অঞ্চলের সামাজিক স্মৃতি। সেই বিবেচনায় মোহিনী মিল কুষ্টিয়ার শিল্প-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পুরোনো শিল্পকারখানা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, ভবন ও যন্ত্রপাতির ঐতিহাসিক মূল্য নিরূপণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা জরুরি। তৃতীয়ত, সংরক্ষণযোগ্য অংশগুলো নথিভুক্ত করে ছবি, নকশা, দলিল ও মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করা যেতে পারে।

সম্ভাব্য উদ্যোগের মধ্যে শিল্প-ঐতিহ্য জাদুঘর, সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনা, গবেষণা ও প্রদর্শনীকেন্দ্র অথবা উপযুক্ত পরিকল্পনার আওতায় নতুন শিল্পকার্যক্রমের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে মালিকানা, আইনগত অবস্থা, কারিগরি সম্ভাব্যতা ও অর্থায়নের বিষয়গুলো যাচাই করা অপরিহার্য।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি: আমির হামজার মোহিনী মিল পুনরায় চালুর অঙ্গীকার

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ (কুষ্টিয়া সদর) আসন থেকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি আমির হামজা নির্বাচিত হন। তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল পরিত্যক্ত মোহিনী মিল আবার পুনরায় চালু করা।

এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া চিনিকল ও মোহিনী মিলের অব্যবহৃত জমি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া বা অর্থনৈতিক অঞ্চল/শিল্পপার্ক হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব তোলেন; বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহের কথা জানান এবং বেশ কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন। পরে দৈনিক আন্দোলনের বাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন — মোহিনী মিল ও কুষ্টিয়া সুগার মিলসহ প্রায় এক হাজারের বেশি বিঘা অব্যবহৃত সরকারি জমি সমন্বিত পরিকল্পনায় কাজে লাগানো হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হয়; তাঁর ভাষায়, মোহিনী মিল-কেন্দ্রিক অর্থনীতি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে।

তবে বাস্তবে অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়। নির্বাচনের পর এ পর্যন্ত মোহিনী মিল পুনরায় চালুর সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ, সময়সূচি বা বিনিয়োগ-ঘোষণার প্রকাশিত খবর জানা যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবতাও জটিল — প্রায় অর্ধেক জমি বেদখল, সম্পদ অপসারণের অভিযোগ এবং লিকুইডেশন সেলের নিয়ন্ত্রণে থাকা বোঝায় পুনরুদ্ধারের পথে আইনি ও প্রশাসনিক ধাপ থেকেই যাবে। প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তা আগামী সময়েই স্পষ্ট হবে।

মোহিনী মিল পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা

মোহিনী মিলকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ঐতিহাসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

মিলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হলে আবেগের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক ও কারিগরি পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে আগের মতো উৎপাদন শুরু করা সম্ভব কি না, ভবনগুলো কতটা ব্যবহারযোগ্য, নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন কতটুকু এবং বর্তমান বাজারে কোন ধরনের উৎপাদন লাভজনক হতে পারে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা প্রয়োজন।

যদি পূর্ণাঙ্গ বস্ত্রকল হিসেবে পুনরায় চালু করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হয়, তাহলে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে, শিল্পকার্যক্রম পুনরায় শুরু করা সম্ভব না হলে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর উপযুক্ত অংশ সংরক্ষণ এবং বিকল্প ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তির বৈধ মালিক, স্থানীয় প্রশাসন, সংসদ সদস্য, শিল্পবিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবিদ এবং কুষ্টিয়ার নাগরিকদের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, সম্পত্তির অবস্থা মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কুষ্টিয়ার ইতিহাসে মোহিনী মিলের গুরুত্ব

কুষ্টিয়া সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। তবে এ অঞ্চলের ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্প ও অর্থনীতির বিকাশ। মোহিনী মিল সেই শিল্প-ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিল্পোদ্যোক্তার উদ্যোগ, বস্ত্র উৎপাদনের বিকাশ, শ্রমিকদের কর্মজীবন, জাতীয়করণ, উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং পুনরায় চালুর নানা প্রচেষ্টা। ফলে মোহিনী মিলের ইতিহাস কেবল অতীতের একটি কারখানার বিবরণ নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পব্যবস্থার পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝারও একটি ক্ষেত্র।

মোহিনী মিলের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধভাবে তুলে ধরতে প্রবীণ শ্রমিক ও কর্মচারীদের সাক্ষাৎকার, পুরোনো ছবি, নিয়োগপত্র, বেতনসংক্রান্ত নথি, উৎপাদন প্রতিবেদন, কোম্পানির দলিল এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতিচারণ সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এসব উপাদান সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মিলটির প্রকৃত ইতিহাস আরও নির্ভরযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।

উপসংহার

মোহিনী মিল কুষ্টিয়ার শিল্প-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। একসময় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ভূমিকা রাখা এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর অতীত যেমন স্থানীয় মানুষের গর্বের অংশ, তেমনি বর্তমান অবস্থা শিল্পসম্পদ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

মোহিনী মিলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রয়োজন ইতিহাসের যথাযথ নথিভুক্তি, সম্পত্তি ও আইনি অবস্থার স্বচ্ছতা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। প্রতিষ্ঠানটি আবার শিল্পকার্যক্রমে ফিরবে, নাকি এর ঐতিহাসিক অংশ সংরক্ষণের মাধ্যমে নতুন পরিচয় পাবে—সেই সিদ্ধান্ত তথ্য, সম্ভাব্যতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

কুষ্টিয়ার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি পুরোনো কারখানার স্মৃতি ধরে রাখা নয়; বরং এই অঞ্চলের শ্রম, উদ্যোগ, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ

  1. কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন — মোহিনী মিল: kushtia.gov.bd/pages/tourist-spot
  2. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২১ মে ২০১০) — মোহিনী মিল চালু হল শাহ মখদুম নামে: bangla.bdnews24.com/bangladesh/article463186
  3. প্রথম আলো (১৫ জানুয়ারি ২০২৪) — ৪ দশকেও বিক্রি হলো না কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল: prothomalo.com/bangladesh/o3qhyiaq0u
  4. কুষ্টিয়াশহর.কম (১১ জুন ২০১৭) — কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল (ইতিহাস-গবেষণা নিবন্ধ): kushtiatown.com/our-history/14-mohini-mohon/426-kushtia-mohini-mill
  5. ভোরের কাগজ (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪) — কুষ্টিয়ায় হরিলুট হচ্ছে পরিত্যক্ত মোহিনী মিলের মূল্যবান সম্পদ: bhorerkagoj.net/tp-country/740317
  6. বাংলা উইকিপিডিয়া — মোহিনী মিল: bn.wikipedia.org/wiki/মোহিনী_মিল

Comments

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন