“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি… আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে তাকওয়াবান।” — সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩

Select your language

হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) মাজার শরীফ: কারাগারের দেয়াল যাকে আটকাতে পারেনি
হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) মাজার শরীফ: কারাগারের দেয়াল যাকে আটকাতে পারেনি
  • Sub Title: এক সুফি দরবেশের অমর উপস্থিতি

পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উঁচু ও কঠোর প্রাচীরের গায়ে লেগে আছে এক নীরব অথচ শক্তিশালী আধ্যাত্মিক উপস্থিতি—হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) মাজার শরীফ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ইতিহাস, স্থাপত্য, জনবিশ্বাস এবং সুফি ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল, যা শতাব্দী পেরিয়েও মানুষের হৃদয়ে অম্লান।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কারাগার বনাম মাজার

ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) ছিলেন একজন প্রাচীন সুফি দরবেশ, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বহু আগেই এই অঞ্চলে সাধনা ও মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর এই স্থানেই তাঁকে দাফন করা হয়, যা অচিরেই স্থানীয় জনগণের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণের সময় নির্মাণ পরিকল্পনায় অনিচ্ছাকৃতভাবে এই পবিত্র সমাধিস্থলটি কারাগারের সীমানার ভেতরে পড়ে যায়।

দেয়াল ভাঙার রহস্য ও স্বপ্নাদেশ

কারাগারের নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই ঘটে এক বিস্ময়কর ঘটনা। মাজারসংলগ্ন কারাগারের বাউন্ডারি দেওয়ালটি টানা তিন দিন ধরে ভেঙে পড়ে। প্রতিবারই দেওয়াল সংস্কার করা হলেও পরদিন তা আবার ধসে যায়—যার কোনো ভৌত ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ দিতে পারেননি।

চতুর্থ দিনের দিবাগত রাতে কারাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি জেলার এক তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) তাঁকে প্রশ্ন করেন—

আমি তো কোনো আসামি নই, আমাকে কেন জেলখানায় বন্দি করা হলো?

কর্তৃপক্ষের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

এই স্বপ্নের কথা জানার পর কারাগার কর্তৃপক্ষ এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মূল নকশা পরিবর্তন করে কারাগারের বাউন্ডারি দেওয়ালটি অর্ধচন্দ্রাকারে বাঁকিয়ে নির্মাণ করা হয়, যাতে মাজারটি কারাগারের মূল সীমানার বাইরে অবস্থান করে। আজও সেই অর্ধচন্দ্রাকার প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে—আধ্যাত্মিকতার প্রতি রাষ্ট্রিক স্বীকৃতির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে।

স্থাপত্যিক তাৎপর্য: আধ্যাত্মিকতার নীরব বিজয়

এই অর্ধচন্দ্রাকার দেয়াল প্রতীকীভাবে ঘোষণা করেঃ-

  1. জাগতিক ক্ষমতা আধ্যাত্মিক সত্যের কাছে নতিস্বীকার করেছে
  2. ঔপনিবেশিক শাসনও স্থানীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানাতে বাধ্য হয়েছে
  3. প্রকৃত পবিত্রতা কোনো প্রাচীর বা নিয়মে আবদ্ধ করা যায় না

বিশেষ বিশ্বাস:-

হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) নির্দোষ মানুষের আইনি জটিলতা ও অন্যায় কারাবাস থেকে মুক্তির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

বর্তমান রীতি ও পরিচালনা

দৈনিক সম্মান প্রদর্শনঃ-

একটি বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ রীতি হিসেবে, প্রতিদিন কারাগারের আসামি গণনার সময় হযরত মাক্কু শাহ (রঃ)-এর মাজারে ফুলের মালা অর্পণ করা হয়। শতবর্ষাধিক সময় ধরে চলে আসা এই রীতি মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য নিদর্শন।

বার্ষিক উরস (১৫ রজব)

  • সকাল ১১:৩০ — কোরআন তিলাওয়াত
  • বাদ আছর — মিলাদ ও দোয়া
  • বাদ মাগরিব — রওজা গোসল ও গিলাফ চাদর চরানো
  • বাদ এশা — সামা ও কাওয়ালি
  • ভোর ৪:৩০ — তবারক বিতরণ

পরিচালনা ব্যবস্থাঃ-

মাজারটি বংশানুক্রমিক খাদেম ব্যবস্থায় পরিচালিত—

সাবেক খাদেম: মরহুম মোঃ আলাউদ্দিন আলাদু ও নাসরুল্লাহ মিয়া

বর্তমান প্রধান খাদেম: মোঃ আক্তার হোসেন

মাজারের আদব ও নিয়মঃ-

  • মাজারের পবিত্রতা রক্ষা করা আবশ্যক
  • নামাজ কাজা করা যাবে না
  • মাজারে সিজদা করা নিষিদ্ধ
  • শালীন পোশাক ও পরিমিত আচরণ বজায় রাখতে হবে

সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যঃ-

হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) মাজার শরীফঃ

  • বাংলার সুফি ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন
  • ঔপনিবেশিক শক্তি ও স্থানীয় সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ার দলিল
  • ধর্ম, বিশ্বাস ও মানবিকতার মিলনস্থল
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নীরব প্রতীক

উপসংহার: অদৃশ্য প্রাচীরের গল্প

হযরত মাক্কু শাহ (রঃ) মাজার শরীফের গল্প আমাদের শেখায় যে, কিছু সত্য এমন যাকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা যায় না, কিছু উপস্থিতি এমন যা আইন বা নিয়ম দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। পুরান ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই অর্ধচন্দ্রাকার প্রাচীরটি নীরবে বলে চলেছে একটি অমর বাণী –

যে সত্য অন্তরে বাস করে, তাকে কোনো কারাগারে বন্দি রাখা যায় না।

আজও যখন কারাগারের আসামিরা গণতি দেয়ার সময় মাজারে ফুলের মালা অর্পণ করে, তখন এটি শুধু একটি রীতি নয়, বরং মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আমাদের সকলকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে।

Comments

ইতিহাস এর অন্যান্য প্রবন্ধ

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন