“✨ ১২ বছরের গল্প, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে কুষ্টিয়াশহর.কম”

Select your language

আল্লারদর্গা নামকরণের ইতিহাস: সাধক আলম ফকির ও লোকঐতিহ্যের গল্প
আল্লারদর্গা নামকরণের ইতিহাস: সাধক আলম ফকির ও লোকঐতিহ্যের গল্প

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার একটি পরিচিত জনপদ আল্লারদর্গা। নামটি শুনলেই অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এখানে কি কোনো মাজার বা দরগা রয়েছে? বাস্তবে বর্তমানে এখানে নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বড় মাজার বা দরগা নেই। তবে আল্লারদর্গা নামটির পেছনে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস, সাধক আলম ফকিরকে ঘিরে প্রচলিত নানা কাহিনি এবং দীর্ঘদিনের লোকস্মৃতি।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় আড়াইশ বছর আগে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে একটি পরিবার এসে তৎকালীন কুষ্টিয়া অঞ্চলের দৌলতপুর উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের মিরপুর এলাকায় কয়েকটি তালুক নিয়ে বসবাস শুরু করে। ওই পরিবারের কর্তা ছিলেন ছুটি মণ্ডল। তাঁর পাঁচ ছেলে—মিলন, আলম, চাঁদ, সুবাদ ও ফতাব মণ্ডল।

এই পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আলম মণ্ডল ছিলেন ধর্মপ্রাণ, নির্জনপ্রিয় ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতি অনুরাগী। পরবর্তীকালে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে আলম ফকির নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর জীবন ও সাধনাকে কেন্দ্র করেই একসময় একটি স্থানের নাম হয়ে ওঠে ‘আলমের দরগা’, যা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে আল্লারদর্গা নামে পরিচিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।

আলম ফকিরের সাধনাস্থল

স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, আলম ফকির ঘোলদহ নদীর তীরে—বর্তমান হিসনা নদীর তীরবর্তী এলাকায়—নিরিবিলি পরিবেশে একটি উপাসনাস্থল বা সাধনাস্থল গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমানে ওই স্থানে একটি মসজিদ রয়েছে।

তৎকালীন সময়ে এই স্থানটি ছিল নদীকেন্দ্রিক জনপদ। নদীপথে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থার একটি মাধ্যম। স্থানীয় ইতিহাসে ঘোলদহ নদীকে ঘিরেও নানা স্মৃতি প্রচলিত রয়েছে।

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় নদীর পানি অনেক সময় ঘোলা থাকত এবং সেখান থেকেই নদীটির নাম ‘ঘোলদহ’ হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তীকালে নদীটি হিসনা নদী নামে পরিচিত হয়।

হিসনা নদী ও সোনাইকুন্ডি

একসময় হিসনা নদী ছিল প্রবাহমান ও গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। পদ্মার সঙ্গে সংযোগ থাকার কারণে নদীটি নৌযান চলাচলের উপযোগী ছিল। স্থানীয় মানুষের যাতায়াত এবং বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এই নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সোনাইকুন্ডি নামের একটি জনপদ। স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, নদীর সৌন্দর্য ও যোগাযোগের সুবিধার কারণে তৎকালীন ইংরেজরা সোনাইকুন্ডি এলাকায় হিসনা নদীর তীরে একটি কুঠি নির্মাণ করেছিল।

তবে এসব তথ্যের অনেকটাই স্থানীয় ইতিহাস ও লোকস্মৃতিনির্ভর। তাই এ বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য সরকারি বা ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া গেলে ইতিহাসটি আরও সুস্পষ্টভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব।

‘আলমের দরগা’ থেকে ‘আল্লারদর্গা’

আলম ফকিরের সাধনাস্থলের আশপাশে ধীরে ধীরে মানুষের বসতি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় মানুষের মুখে জায়গাটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘আলমের দরগা’ নামে।

সময়ের সঙ্গে ‘আলমের দরগা’ নামটি পুরো এলাকার পরিচিতি হয়ে যায়। কিন্তু প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বিষয়টি আলম ফকির নিজে পছন্দ করেননি।

তিনি মনে করতেন, কোনো স্থান তাঁর ব্যক্তিগত নামে পরিচিত হওয়া উচিত নয়। তাঁর বিশ্বাস ছিল—এই পৃথিবীর সবকিছুর মালিক মহান আল্লাহ। তাই নিজের নামের পরিবর্তে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে এলাকার নামকরণ করার জন্য তিনি স্থানীয় মানুষকে অনুরোধ করেন।

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর সেই অনুরোধের পর ‘আলমের দরগা’ নামটি পরিবর্তিত হয়ে ‘আল্লারদর্গা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

এভাবেই স্থানীয় লোকস্মৃতি অনুসারে আজকের আল্লারদর্গা নামটির উৎপত্তি।

কৃষ্ণনগর আদালতে আলম ফকিরের শেষ সময়

আলম ফকিরকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত সবচেয়ে আলোচিত কাহিনিগুলোর একটি তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, আলম ফকির কোনো একটি মামলার সাক্ষী হিসেবে তৎকালীন ভারতের কৃষ্ণনগর আদালতে গিয়েছিলেন। সেখানে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় নিয়ে তিনি বিচারককে জানিয়েছিলেন যে, দুপুরের আগেই তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে।

বিচারক এর কারণ জানতে চাইলে আলম ফকির নাকি বলেছিলেন, দুপুরের পর তিনি আর এই পৃথিবীতে থাকবেন না।

কাহিনিটি অনুযায়ী, বিচারক তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে বিষয়টি যাচাই করতে দুপুরের পর সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করেন। পরে আলম ফকির আদালতের বারান্দায় মৃত্যুবরণ করেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

তাঁর মরদেহ পরবর্তীতে কুষ্টিয়া অঞ্চলের হাড়াভাঙ্গা মোল্লাপাড়া এলাকায় তাঁর পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয় বলে স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনায় জানা যায়।

হাড়াভাঙ্গায় দাফনের লোককথা

আলম ফকিরের দাফন নিয়েও একটি চমকপ্রদ লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, গরুর গাড়িতে করে আলম ফকিরের মরদেহ হাড়াভাঙ্গা গ্রামে আনার পর একটি নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গাড়ি আর এগোচ্ছিল না। জোর করে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করলে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল, আর নির্দিষ্ট দিকে নিলে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল—এমন কথাও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত।

এই লোককাহিনির ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, তৎকালীন ইছামতি নদীর উত্তরে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়েছিল। বর্তমানে নদীটির আগের অস্তিত্ব না থাকলেও স্থানীয় মানুষ তাঁর সমাধিস্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ করে আসছেন বলে জানা যায়।

এ ধরনের বর্ণনা মূলত লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি; এগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার জন্য প্রামাণ্য দলিল প্রয়োজন।

ঘোষের তিন টাকা পাওনার কাহিনি

আলম ফকিরকে ঘিরে আরেকটি গল্প স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। বলা হয়, এক ঘোষের কাছে আলম ফকিরের তিন টাকা পাওনা ছিল।

একদিন ভেড়ামারা উপজেলার হাওয়াখালি এলাকায় ঘোষের সঙ্গে আলম ফকিরের সাক্ষাৎ হয় বলে কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। ঘোষ তাঁর পাওনা টাকার কথা বললে আলম ফকির তাঁকে নিজের বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসতে বলেন। তিনি নাকি কোরআন শরিফের একটি নির্দিষ্ট পাতায় টাকা রাখা আছে বলেও জানান।

ঘোষ বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানালে পরিবারের সদস্যরা বিস্মিত হন। পরে কোরআন শরিফের ওই নির্দিষ্ট পাতায় সত্যিই টাকা পাওয়া যায়—এমনটাই প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়।

কাহিনির আরেক অংশে বলা হয়, আলম ফকির ঘোষকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি কাউকে বলতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে পরিবারের চাপে ঘোষ বিষয়টি প্রকাশ করেন এবং এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান বলে লোকমুখে প্রচলিত।

এই ঘটনাটিও স্থানীয় লোকবিশ্বাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

গরু ও দুধ নিয়ে প্রচলিত গল্প

আলম ফকিরের জীবদ্দশাকে ঘিরে আরও বেশ কিছু গল্প স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

বলা হয়, তাঁর অনেক গরু ছিল। কোনো কৃষক চাষের জন্য গরু চাইলে তিনি কতটুকু জমি চাষ করা হবে তা জেনে নিতেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, নির্ধারিত পরিমাণ জমি চাষ শেষ হলে গরুগুলো আর সামনে এগোত না।

একইভাবে কোনো ব্যক্তি গাভীর দুধ চাইলে কতটুকু দুধ প্রয়োজন তা জানানো হতো। লোককথা অনুযায়ী, নির্ধারিত পরিমাণ দুধ দোহন হওয়ার পর গাভী আর দুধ দিত না।

এসব কাহিনি স্থানীয় মানুষের মধ্যে আলম ফকিরের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও অলৌকিকতার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

আল্লারদর্গা জামে মসজিদ

দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে আলম ফকিরের সাধনাস্থলের জায়গায় একটি টিনের ছাউনি দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে মসজিদটির নাম দেওয়া হয় আল্লারদর্গা জামে মসজিদ

বর্তমান মসজিদটি সেই পুরোনো স্মৃতির ধারাবাহিকতা বহন করছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। ফলে আল্লারদর্গা নামটি শুধু একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সাধককে ঘিরে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের স্থানীয় স্মৃতি ও বিশ্বাস।

মানত ও লোকবিশ্বাস

আলম ফকিরের মৃত্যুর পর তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়। দূর-দূরান্তের মানুষও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে এসে মানত করতেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউ পারিবারিক কোনো ইচ্ছা পূরণের প্রত্যাশায় সেখানে মানত করতেন। ছাগল, মোরগসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে আসার কথাও স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যায়।

এসব বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে রয়েছে।

আল্লারদর্গা নামের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

একটি স্থানের নাম অনেক সময় শুধু ভৌগোলিক পরিচয় বহন করে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও বহু প্রজন্মের স্মৃতি। আল্লারদর্গা তার একটি উদাহরণ।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, একজন সাধক আলম ফকিরের সাধনাস্থলকে কেন্দ্র করে প্রথমে ‘আলমের দরগা’ নামটি প্রচলিত হয়। পরবর্তীতে নিজের নামে নয়, আল্লাহর নামে এলাকার পরিচিতি দেওয়ার তাঁর ইচ্ছা থেকেই ‘আল্লারদর্গা’ নামটির প্রচলন ঘটে।

আজও দৌলতপুরের এই জনপদ সেই নামেই পরিচিত। আলম ফকিরকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনিগুলোর সবগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করা সম্ভব না হলেও এগুলো স্থানীয় মানুষের মৌখিক ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ

তাই আল্লারদর্গার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে শুধু একটি নামের উৎপত্তি নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নদী, জনপদ, সাধক, ধর্মীয় স্থাপনা এবং মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতির ধারাটিও বিবেচনায় নিতে হয়।

তথ্যসূত্র: দ্য কুষ্টিয়া রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডট কম; স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা ও লোকমুখে প্রচলিত তথ্য।

 

Comments

কুষ্টিয়া সম্পর্কিত তথ্য

সর্বশেষ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

তথ্য সম্পর্কে খবর

আমাদের নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন এবং আপডেট থাকুন