কুষ্টিয়া শুধু বাউল সম্রাট ফকির লালন শাঁইজীর স্মৃতিধন্য জনপদ নয়; ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও শিল্প-ঐতিহ্যের দিক থেকেও এ জেলার রয়েছে সমৃদ্ধ পরিচয়। লালন শাঁইজীর মাজার, শিলাইদহ কুঠিবাড়ী, লালন শাহ সেতু, রেইনউইক বাঁধ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বসতভিটাসহ কুষ্টিয়ায় রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।
একই সঙ্গে কুষ্টিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবেও পরিচিত। জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বহু পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে জগতি এলাকায় অবস্থিত কুষ্টিয়া চিনি কল লিমিটেড অন্যতম।
শুধু একটি চিনি উৎপাদনকারী কারখানা হিসেবে নয়, কয়েক দশকের শিল্প-ইতিহাস, শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কুষ্টিয়া চিনি কলের রয়েছে আলাদা পরিচয়।
কুষ্টিয়া চিনি কল কোথায়?
কুষ্টিয়া চিনি কল লিমিটেড কুষ্টিয়া জেলার কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জগতি এলাকায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি নথিতেও ঠিকানা হিসেবে জগতি, কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া উল্লেখ রয়েছে।
কুষ্টিয়া শহর থেকে জগতি খুব বেশি দূরে নয়। ফলে শহর থেকে সহজেই সড়কপথে এই শিল্পাঞ্চলে যাওয়া যায়। জগতিতে চিনি কলের পাশাপাশি রয়েছে জগতি রেলস্টেশন ও বাজার এলাকা।
কুষ্টিয়া চিনি কলের ইতিহাস
কুষ্টিয়া চিনি কলের ইতিহাস ষাটের দশকের শুরুতে। বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনের সময়কাল ১৯৬১–৬২ সালের দিকে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৬৫–৬৬ অর্থবছরে এখানে চিনি উৎপাদন শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো কুষ্টিয়া চিনি কলও সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (BSFIC)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন। সরকারি নিরীক্ষা-সংক্রান্ত নথিতেও কুষ্টিয়া চিনিকল লিমিটেডকে বিএসএফআইসির অধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সম্পূর্ণ শেয়ার বাংলাদেশের সরকারের মালিকানাধীন—এ তথ্যও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
একটি বড় শিল্প কমপ্লেক্স
কুষ্টিয়া চিনি কল শুধু একটি মূল চিনি উৎপাদন ইউনিট নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন সহায়ক অবকাঠামো ও কার্যক্রম। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির আওতায় শিল্প এলাকা, আবাসিক এলাকা, রাস্তা ও রেল-সংযোগ এবং আখ সংগ্রহের বিভিন্ন সুবিধা গড়ে উঠেছে।
চিনি উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল আখ। তাই কুষ্টিয়া ও আশপাশের কৃষি এলাকার সঙ্গে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আখ সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষ যুক্ত থাকেন।
উৎপাদন ক্ষমতা
কুষ্টিয়া চিনি কলের আখ মাড়াইয়ের স্থাপিত ক্ষমতা প্রতিদিন ১,৫২৪ মেট্রিক টন (TCD)। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিতেও ১,৫২৪ TCD উৎপাদন ক্ষমতার উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠার সময় মিলটির আখ মাড়াই ক্ষমতা ছিল তুলনামূলকভাবে কম; পরবর্তী সময়ে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ১,৫২৪ টন/দিনে উন্নীত করা হয়।
চিনি উৎপাদনের পরিমাণ অবশ্য আখের সরবরাহ, আখের মান, উৎপাদন মৌসুম, কারখানার কার্যক্ষমতা এবং অন্যান্য কারিগরি ও অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
কুষ্টিয়া চিনি কলে কী কী উৎপাদিত হয়?
আখ থেকে শুধু চিনি নয়, চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজাতও পাওয়া যায়। কুষ্টিয়া চিনি কলের প্রধান উৎপাদিত ও উপজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে—
- চিনি
- চিটাগুড় বা মোলাসেস (Molasses)
- ব্যাগাস (Bagasse)
- প্রেসমাড (Press Mud)
প্রতিষ্ঠানের নথিতে প্রধান পণ্য হিসেবে প্ল্যান্টেশন হোয়াইট সুগার এবং উপজাত হিসেবে মোলাসেসের উল্লেখ রয়েছে।
ব্যাগাস মূলত আখ মাড়াইয়ের পর অবশিষ্ট আঁশজাতীয় উপাদান, আর প্রেসমাড চিনি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া একটি উপজাত। এসব উপজাত কৃষি, জ্বালানি ও অন্যান্য শিল্পকার্যে ব্যবহারযোগ্য।
চিনি উৎপাদনের প্রক্রিয়া
একটি চিনি কলের কার্যক্রম মূলত আখ সংগ্রহ থেকে শুরু হয়। কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা আখ কারখানায় আনা হলে প্রথমে তা পরিষ্কার ও ওজন করা হয়। এরপর যন্ত্রের মাধ্যমে আখ মাড়াই করে রস বের করা হয়।
পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আখের রস পরিশোধন, ঘন করা ও স্ফটিকায়ন করা হয়। এভাবেই তৈরি হয় চিনি। একই প্রক্রিয়ায় মোলাসেস, ব্যাগাস ও প্রেসমাডের মতো উপজাতও পাওয়া যায়।
অর্থাৎ একটি চিনি কল মূলত কৃষি ও শিল্প—এই দুই খাতকে একই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে।
কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে চিনি কলের ভূমিকা
কুষ্টিয়া চিনি কলের গুরুত্ব শুধু চিনি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আখ চাষি, শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরিবহনকর্মী, ঠিকাদার ও বিভিন্ন সহায়ক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার সঙ্গেও এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে।
আখের মৌসুমে কৃষকদের উৎপাদিত আখ কারখানায় সরবরাহ করা হয়। ফলে আখ চাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে চিনিকলের প্রভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারি শিল্প কাঠামোতেও চিনিকলগুলো কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের আখ, যান্ত্রিকীকরণ, সেচব্যবস্থা ও কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আখ উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও বিএসএফআইসির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জগতির শিল্প-ঐতিহ্যের একটি অংশ
কুষ্টিয়ার জগতি শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এ অঞ্চলের সঙ্গে কুষ্টিয়ার শিল্প ও যোগাযোগের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। জগতি রেলস্টেশন এবং চিনি কলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি শিল্প-অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই চিনি কল আজও কুষ্টিয়ার শিল্প-ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য স্মারক। বহু বছর ধরে এর সঙ্গে কাজ করেছেন অসংখ্য শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তাদের শ্রম ও অবদানের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি কুষ্টিয়ার শিল্প ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
দর্শনার্থীদের জন্য কুষ্টিয়া চিনি কল
কুষ্টিয়ায় ঘুরতে এলে সাধারণত লালন শাঁইজীর মাজার, শিলাইদহ কুঠিবাড়ী, মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা কিংবা লালন শাহ সেতুর মতো ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলোই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু কুষ্টিয়ার শিল্প-ঐতিহ্য জানতে চাইলে জগতির কুষ্টিয়া চিনি কলও আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
একটি ঐতিহ্যবাহী চিনি কলের বিশাল শিল্প অবকাঠামো, পুরোনো স্থাপনা, যন্ত্রপাতি, আখ পরিবহন ও চিনি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি কুষ্টিয়ার শিল্প ইতিহাসকে কাছ থেকে বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করে।
তবে এটি একটি চলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনুমতি ছাড়া কারখানার ভেতরে প্রবেশ বা শিল্পকার্যক্রমের ছবি তোলা উচিত নয়। কেউ সরাসরি পরিদর্শন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়াই নিরাপদ ও যথাযথ।
কুষ্টিয়ার ইতিহাসে কুষ্টিয়া চিনি কল
কুষ্টিয়ার পরিচয় শুধু সাহিত্য, সংগীত ও লোকসংস্কৃতিতে নয়; এই জেলার ইতিহাসে শিল্পেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। সেই শিল্প-ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী জগতির কুষ্টিয়া চিনি কল লিমিটেড।
ষাটের দশকে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান কয়েক দশক ধরে কুষ্টিয়ার কৃষি, শ্রম ও শিল্প অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই কুষ্টিয়ার দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর তালিকায় শুধু স্থাপত্য কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান নয়—শিল্প-ঐতিহ্যের স্থান হিসেবেও কুষ্টিয়া চিনি কলকে দেখার সুযোগ রয়েছে।
কুষ্টিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য জগতির এই পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে জেলার শিল্প-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সংক্ষিপ্ত তথ্য
| প্রতিষ্ঠানের নাম | কুষ্টিয়া চিনি কল লিমিটেড |
|---|---|
| ইংরেজি নাম | Kushtia Sugar Mills Limited |
| অবস্থান | জগতি, কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া |
| প্রতিষ্ঠার সময়কাল | ১৯৬১–৬২ |
| উৎপাদন শুরু | ১৯৬৫–৬৬ |
| ব্যবস্থাপনা | বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (BSFIC) |
| আখ মাড়াই ক্ষমতা | ১,৫২৪ মেট্রিক টন/দিন |
| প্রধান পণ্য | চিনি |
| উপজাত | মোলাসেস/চিটাগুড়, ব্যাগাস, প্রেসমাড |
| শিল্পের ধরন | চিনি কারখানা |






















Comments