বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে— যেখানে প্রযুক্তিই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। শিক্ষা ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। অতীতে খাতা-কলমের সীমাবদ্ধতায় যেভাবে শিক্ষার প্রসার বাধাগ্রস্ত হতো, আজ প্রযুক্তির কারণে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হয়েছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন চলছে ডিজিটাল রূপান্তর— স্মার্ট ক্লাসরুম, অনলাইন কোর্স, ভার্চুয়াল ল্যাব, ও ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তার বাস্তব উদাহরণ।
প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষায় পরিবর্তন
- স্মার্ট ক্লাসরুম ও মাল্টিমিডিয়া শিক্ষা: দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজে এখন মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান করা হচ্ছে। শিক্ষকরা ছবি, ভিডিও ও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝাতে পারছেন।
- অনলাইন শিক্ষা ও ভার্চুয়াল ক্লাস: কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষা ছিল এক বিপ্লব। আজও Zoom, Google Meet, Microsoft Teams এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ক্লাস করছে।
- ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপ: 10 Minute School, Bohubrihi, Skills for Employment — এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এখন তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির বড় মাধ্যম।
- ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ওপেন রিসোর্স: শিক্ষার্থীরা এখন Google Scholar বা Bangladesh Open University-এর e-library থেকে সহজেই রেফারেন্স খুঁজে পাচ্ছে।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিকৃত শিক্ষা: AI-ভিত্তিক শিক্ষা অ্যাপ শিক্ষার্থীর দুর্বল দিক চিহ্নিত করে তাকে অনুযায়ী পাঠ সাজায়। ফলে শেখা আরও ফলপ্রসূ হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ সরকার “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১” ভিশনের অংশ হিসেবে শিক্ষা খাতে প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
- “একশত স্মার্ট স্কুল প্রকল্প” চালু হয়েছে।
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে ৩০,০০০-এরও বেশি স্কুলে।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
- অনলাইন পরীক্ষার ধারণাও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে।
তবে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিভাইসের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
- ডিজিটাল বিভাজন: শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান এখনও স্পষ্ট।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি: অনেক শিক্ষক প্রযুক্তি ব্যবহারে যথেষ্ট দক্ষ নন।
- ডিভাইসের অভাব: অনেক শিক্ষার্থী স্মার্টফোন বা কম্পিউটার না থাকায় অনলাইন শিক্ষায় অংশ নিতে পারে না।
- নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট: অনেক স্কুলে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অনলাইন শিক্ষার ধারাবাহিকতা থাকে না।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
- AI ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি দিয়ে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবে ভার্চুয়াল ল্যাবে।
- জাতীয় পর্যায়ে “একটি শিক্ষা, একটি প্ল্যাটফর্ম” নীতিতে সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব।
- স্মার্ট শিক্ষক ও স্মার্ট শিক্ষার্থী — এই যুগল সমন্বয়ই গড়বে সত্যিকারের স্মার্ট বাংলাদেশ।
প্রযুক্তি এখন আর শিক্ষার পরিপূরক নয়, বরং অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে যন্ত্র নয়, মানুষই হবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক — এই ধারণা ভুলে গেলে শিক্ষা হবে কৃত্রিম, মানবিক নয়।
সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে, যেখানে শেখা হবে সবার জন্য সহজ, আনন্দময় ও সমানাধিকারমূলক।

Comments